শনিবার, ১৭ আগস্ট, ২০১৩

আসুন জেনে নেই, চাঁদ দেখা সম্পর্কে হানাফী ফিকহের বক্তব্য

আসুন জেনে নেই, চাঁদ দেখা সম্পর্কে হানাফী ফিকহের বক্তব্য

(১) হানাফি মাযহাবের বিশ্ব বিখ্যাত ও সর্বজন বিদিত ফিকহ্ গ্রন্থ “ফতহুল কাদির”-এর ভাষ্য হচ্ছে-

"যখন কোন শহরে চাঁদ দেখা প্রমাণিত হবে, তখন সকল মানুষের উপর রোযা রাখা ফরয হবে। ফিকহের প্রতিষ্ঠিত মাযহাব অনুযায়ী পাশ্চাত্য বাসীর চাঁদ দেখার দ্বারা প্রাচ্য বাসীর জন্য রোযা রাখা ফরয হবে।"
(ফতহুল কাদির, খন্ড-২, পৃঃ-৩১৮) অথবা (ফতহুল কাদির, খন্ড-৪, পৃঃ-২১৬)

(২) হানাফি মাযহাবের প্রসিদ্ধ কিতাব ফাতওয়া-ই- আলমগিরীর সিদ্ধান্ত হলো:

"ফিকহের প্রতিষ্ঠিত বর্ণনানুযায়ী চাঁদ ঊদয়ের বিভিন্নতা গ্রহণীয় নয় । ফতুয়াই কাযী খানের ফাতওয়াও অনুরুপ। ফকীহ আবু লাইছও এমনটাই বলেছেন । শামছুল আইম্মা হোলওয়ানী সিদ্ধান্ত দিয়েছেন যে, যদি পাশ্চাত্যবাসী রমযানের চাঁদ দেখে তবে সে দেখার দ্বারা প্রাচ্য বাসীর জন্য রোযা ওয়াজিব হবে । এমনটাই আছে খোলাছা নামক কিতাবে-"
(ফাতওয়া-ই-আলমগিরী, খন্ড-১, পৃঃ-১৯৮) অথবা (ফাতওয়া-ই-আলমগিরী, খন্ড-৫, পৃঃ-২১৬)

(৩) হানাফি মাযহাবের বিশ্ব বিখ্যাত ফিকহ গ্রন্থ ফাতওয়া-ই-শামী-এর সিদ্ধান্ত হচ্ছে-

"চাঁদের উদয়স্থলের ভিন্নতা গ্রহণীয় হবে কিনা? এ ব্যাপারে মতানৈক্য রয়েছে। এ ভাবে যে, প্রত্যেক দেশের মানুষ নিজ নিজ দেখার ভিত্তিতে আমল করবে? না কি উদয়স্থলের ভিন্নতা গ্রহণযোগ্য হবে না বরং সর্ব প্রথম চাঁদ দেখার ভিত্তিতে সকলের জন্য আমল করা জরুরী হবে? এমনকি প্রাচ্যে যদি জুমার রাতে চাঁদ দেখা যায় আর পাশ্চাত্যে শনিবার রাতে চাঁদ দেখা যায় তবে পাশ্চাত্যের অধিবাসীদের উপর প্রাচ্যের দেখা অনুযায়ী আমল করা ওয়াজিব? এবিষয়ে কেউ কেউ প্রথম মতটি গ্রহণ করেছেন (অর্থাৎ এক দেশের চাঁদ দেখা অন্য দেশের মানুষের জন্য গ্রহনীয় নয়)। ইমাম যায়লায়ী ও ফয়েজ গ্রন্থের প্রণেতা এ মতটি গ্রহণ করেছেন। শাফেয়ী মাযহাবের মতও এটা। তাদের যুক্তি হল চাঁদ দেখার ক্ষেত্রে প্রত্যেক দেশীয় লোক নামাযের ওয়াক্তের মতই নিজ এলাকা বিশেষে সম্বোধিত। যেমন যে অঞ্চলে এশা ও বিতরের ওয়াক্ত হয়না সেখানে এশা ও বিতর নামায আদায় করতে হয়না। আর সুপ্রতিষ্ঠিত মত হচ্ছে দ্বিতীয়টি অর্থাৎ চাঁদ দেখার ভিন্নতা গ্রহনীয় নয়। বরং প্রথম দিনের দেখার দ্বারাই সমগ্র পৃথিবীতে এক কেন্দ্রিক তারিখ গণনা করে, একই দিনে একই তারিখে আমল করতে হবে। এটাই আমাদের হানাফী মাযহাবের সিদ্ধান্ত। মালেকী এবং হাম্বলী মাযহাবের মতও এটা। তাদের দলীল হচ্ছে আয়াত ও হাদীসে চাঁদ দেখার সম্বোধন সকলের জন্য আম বা সার্বজনীন যা নামাজের ওয়াক্তের সম্বোধন থেকে আলাদা"।
(ফাতওয়া-ই-শামী, খন্ড-২, পৃঃ-১০৫ অথবা ফাতওয়া-ই-শামী, খন্ড-২, পৃঃ-৪৩২)

(৪) হানাফি ফিকহের বিশ্ব বিখ্যাত গ্রন্থ “বাহরুর রায়েক”-এর ভাষ্য হচ্ছে-

"চাঁদের উদয় স্থলের ভিন্নতা গ্রহণীয় নয়। অতএব যখন এক দেশের মানুষ চাঁদ দেখবে, তখন অন্য দেশের মানুষের জন্য রোযা রাখা ফরয হবে, যদিও তারা চাঁদ দেখেনি। যদি তাদের নিকট গ্রহণযোগ্য পদ্ধতিতে চাঁদ দেখার সংবাদ পৌঁছে যায়। অতএব পাশ্চাত্যবাসীর দেখার দ্বারা প্রাচ্যবাসীর জন্য রোযা রাখা অত্যাবশ্যক হবে। যদিও কেউ কেউ বলেন উদয় স্থলের বিভিন্নতা গ্রহণযোগ্য। একের দেখা অন্যের জন্য প্রযোজ্য নয়। তবে ফিকহের প্রতিষ্ঠিত সিদ্ধান্ত হচ্ছে প্রথমটি।এমনটাই লেখা হয়েছে ফতহুল কাদির গ্রন্থে। সেখানে বলা হয়েছে এটাই প্রকাশ্য মাযহাব এবং এর উপরই ফাতওয়া। খোলাছা নামক কিতাবের ভাষ্যও তাই"।
(বাহরুর রায়েক, খন্ড-২, পৃঃ-৪৭১)

(৫) বিশ্ব বিখ্যাত গ্রন্থ “তাবয়ীনুল হাকায়েক”-এর ভাষ্য হচ্ছে-

"অত্র গ্রন্থের প্রণেতা (রঃ) বলছেন যে, চাঁদের উদয় স্থলের ভিন্নতা গ্রহণীয় নয়। যদিও কেউ চাঁদের উদয় স্থলের ভিন্নতা গ্রহণীয় হবে বলে মত প্রকাশ করেছেন। “ভিন্নতা গ্রহণীয় নয়” এর অর্থ হচ্ছে যদি এক দেশের অধিবাসীরা নুতন চাঁদ দেখেন এবং অন্য দেশের অধিবাসীরা না দেখেন তবে প্রথম দেশবাসীর দেখা দ্বারাই অন্য দেশবাসীদের জন্য রোযা রাখা ফরয হবে। অধিকাংশ মাশাইখ-ই এমত পোষণ করেছেন। এমনকি এক দেশের মানুষ ৩০টি রোযা রাখল, অন্য দেশের মানুষ রোযা রাখল ২৯টি, তাহলে অন্যদেরকে একটি রোযা কাযা করতে হবে"।
(তাবয়ীনুল হাকায়েক, খন্ড-২, পৃঃ-১৬৪/১৬৫)

(৬) “ফাতওয়া-ই-কাযীখান”-এর ভাষ্য হচ্ছে-

"ফিক্‌হের সুপ্রতিষ্ঠিত মতানুসারে চাঁদের উদয় স্থলের ভিন্নতা গ্রহণীয় নয়। শামসুল আইম্মা হালওয়ানী রহমাতুল্লাহি আলাইহি এমতই উল্লেখ করেছেন"।
(কাযীখান, খন্ড-১, পৃঃ-৯৫)

(৭) বিশ্ব বিখ্যাত গ্রন্থ “হাশিয়া-ই-তাহতাবী” শরীফের ভাষ্য হচ্ছে-

" ঈদুল আযহাসহ সকল মাসের চাঁদের হুকুম শাওয়ালের চাঁদের হুকুমের মতোই। কোন উদয় স্থলে চাঁদ দেখা গেলে দুনিয়ার সকল স্থানের মানুষের উপরই আমল জরুরী হবে। যদি চাঁদ উদয়ের সংবাদ পৌঁছে দুইজন সাক্ষীর সাক্ষ্যে, অথবা কাযীর ফয়সালার উপরে দুইজন সাক্ষ্য দেন, অথবা উদয়ের সংবাদটি ব্যাপক প্রসিদ্ধি লাভ করে"।
(হাশিয়া-ই-তাহতাবী শরীফ, পৃঃ-৩৫৯)

(৮) “মায়ারিফুস্‌ সুনান”-এর ভাষ্য হচ্ছে-

"আমাদের মাযহাবের কিতাব সমূহের উপর ভিত্তি করে আমরা লিখেছি যে, এক দেশের চাঁদ দেখা অন্য দেশে গ্রহণীয় হবে। যদিও দেশ দুটির মধ্যে মাগরিব ও মাশরিকের দূরত্ব হয়। আর এ মাসয়ালা ফকীহ্‌গণের এ নীতিমালার উপর ভিত্তি করে যে চাঁদ উদয়স্থলের ভিন্নতা গ্রহণীয় হবে না। তবে ফকিহগণ সিদ্ধান্ত দিয়েছেন যে, নামায ও ইফতারের ওয়াক্ত সমূহের ভিন্নতা গ্রহণীয় হবে এবং যার যার স্থানীয় সময় অনুযায়ী নামায পড়বে ও ইফতার করবে"।
(মায়ারিফুস্‌ সুনান, খন্ড-৫, পৃঃ-৩৩৭)

(৯) দারুল উলুম দেওবন্দ এর প্রখ্যাত হানাফী আলেম আল্লামা রশীদ আহমদ গোংগুহী (রহঃ)-এর ভাষ্য নিম্নরূপ-

"ফিকহের প্রতিষ্ঠিত মতানুসারে রোযা রাখা ও ঈদ করার ব্যাপারে চাঁদের উদয় স্থলের ভিন্নতা গ্রহণীয় নয়। প্রাচ্যবাসীর দেখা দ্বারাই পাশ্চ্যাত্যবাসীর উপর আমল জরুরী হবে"।
(ফাতওয়া-ই-রশিদিয়া, পৃঃ-৪৩৭)

আল্লামা রশীদ আহমদ গোংগুহী (রহঃ) আরও বলেন

“যদি কোলকাতার মানুষ শুক্রবার চাঁদ দেখে, অথচ মক্কায় তা দেখা গিয়েছে বৃহস্পতিবার, কিন্তু কোলকাতার মানুষ তা জানতে পারেনি, তাহলে যখন তারা জানতে পারবে, তাদের জন্য মক্কার মানুষের সাথে ঈদ করা জরুরী হবে এবং প্রথম রোযা কাযা করতে হবে”।
(রশীদ আহমদ গাংগুহী, শরহে তিরমিযি, কাউকাব উন দুররী, পৃষ্ঠা-৩৩৬ উর্দু সংস্করণ)

(১০) উপমহাদেশের প্রখ্যাত হানাফী আলেম ও গবেষক আল্লামা আশরাফ আলী থানভী (রহঃ)-এর ভাষ্য নিম্নরূপঃ-

"এক শহরের চাঁদ দেখা অন্য সকল শহর বাসীদের জন্য গ্রহণীয় হবে। ঐ শহরগুলোর সঙ্গে চাঁদ দেখা শহরের যত দুরত্বই হোকনা কেন। এমনকি সর্ব পশ্চিমের চাঁদ দেখার সংবাদ সর্ব পূর্বের মানুষের নিকট গ্রহণযোগ্য পদ্ধতিতে পৌছলে ঐ দিনই তাদের উপর রোযা রাখা ফরয হবে।"
(বেহেশতী- জেওর, খন্ড-১১, পৃঃ-৫১০) অথবা(Behishti Zewar, Section 11, pg 104, part 4) [Referenced from ‘Behr Al Raqeeq, pg 270, vol.2; Fatwa Alamghiri pg 97, vol1].

(১১) উপমহাদেশের অন্যতম ইসলামী শিক্ষা কেন্দ্র “দারুল উলুম দেওবন্দ”-এর গ্রান্ড মুফতি আযিযুর রহমান সাহেব ফতোয়া-ই-দারুল উলুম দেওবন্দ-এ লিখেছেন-

"হানাফী মাযহাব মতে চাঁদের উদয় স্থলের ভিন্নতা গ্রহনীয় নয়। যদি কোন স্থানে শা’বান মাসের ২৯ তারিখে রমযানের চাঁদ দেখা যায় এবং শরয়ীভাবে তা প্রমাণিত হয় তখন ঐ হিসেবেই সকল স্থানে রোযা রাখা অপরিহার্য হয়ে যাবে। যে স্থানের লোকেরা সংবাদ পরে পাওয়ার কারণে শা’বান মাস ৩০ দিন পূর্ণ করে রোযা শুরু করেছে তারাও প্রথমদের সঙ্গে ঈদ করবে এবং প্রথমের একটি রোযা কাযা করবে"।
(ফাতওয়া-ই-দারুল উলুম দেওবন্দ, খন্ড-৬, পৃঃ-৩৯৮)

ফাতওয়া দারুল উলুম দেওবন্দে আরও লিখিত রয়েছে,

“যেখানেই চাঁদ দেখা প্রমানিত হয়, সেখান থেকে যত দূরত্বই হোক, এমনকি যদি হাজার মাইল দূরত্বও হয় সেখানকার জনগনকে তা মেনে নিতে হবে”
(ফাতওয়া দারুল উলুম দেওবন্দ, খন্ড-৬, পৃষ্ঠা-৩৮০, উর্দু সংস্করণ)

(১২) একই কথা লিখেছেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত আলেম ও মুফতি আব্দুল কাবী মুলতানী (রহঃ) তার রচিত ছিহাহ ছিত্তা এর ব্যাখ্যা গ্রন্থ “মিফতাহুন্‌ নাজ্‌জাহ্‌” কিতাবে। যার ভাষ্য নিম্নরূপ-

"ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মালেক, ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল, ইমাম লাইছ ইবনু সা’দ আল মিশরী, অধিকাংশ ফকিহগণ এবং ইমাম শাফেয়ী রহমাতুল্লাহি আলাইহি তার এক মতে রমযানের রোযার ক্ষেত্রে এই রায় দিয়েছেন যে, যখন কোন এক জনপদে চাঁদ দেখা প্রমাণিত হবে তখন দুনিয়ার অন্য সকল জনপদে ঐ দেখা গ্রহণীয় হবে। এমনকি পাশ্চাত্য অধিবাসীগণ চাঁদ দেখলে প্রাচ্যের অধিবাসীদের জন্যে ঐ দেখা দলীল হবে। এ সকল মহামান্য ইমামগণের নিকট রমযানের রোযার ক্ষেত্রে চাঁদ উদয় স্থলের ভিন্নতা মোটেই গ্রহণীয় নয়। বরং সমস্ত পৃথিবী এবং সকল উদয় স্থল এক উদয় স্থল হিসেবে গণ্য হবে। এবং সমগ্র পৃথিবী একটি দেশের মতই গন্য হবে। যেখানেই প্রথম চাঁদ দেখা যাবে উক্ত দেখা শরয়ী পদ্ধতিতে অন্যদের নিকট পৌঁছলে তার ভিত্তিতে সকলের জন্য আমল করা জরুরী হবে। উক্ত দুই দেশের মধ্যে যতই দূরত্ব হোকনা কেন। এমন কি যদি অষ্ট্রেলিয়া বা আমেরিকার অধিবাসীগণ চাঁদ দেখেন তাহলে ঐ দেখার দ্বারা পাকিস্তান এবং দূর প্রাচ্যবাসীর উপর রোযা রাখা জরুরী হবে"।
(মিফতাহুন্‌ নাজ্‌জাহ, খন্ড-১, পৃঃ-৪৩২)

(১৩) একই সিদ্ধান্ত দিয়েছেন বাংলাদেশের প্রাচীন ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হাট হাজারী মাদরাসার শাইখুল হাদীস আল্লামা হাফেজ আবুল হাসান সাহেব তার রচিত মিশকাত শরীফের ব্যাখ্যা গ্রন্থ তানযীমুল আশ্তাতে। যার ভাষ্য নিম্নে উদৃত হল-

"চাঁদের উদয় স্থলের ভিন্নতা ইমাম আবু হানিফা রহমাতুল্লাহি আলাইহি-এর নিকট গ্রহণীয় নয়। শামী কিতাবে এমনটাই রয়েছে। এটাই আমাদের (হানাফীদের) রায়। মালেকী ও হাম্বলী মাযহাবের মতও এটা। অতএব, কোন স্থানে চাঁদ দেখা প্রমাণিত হলে সর্বত্রই আমল অত্যাবশ্যকীয় হবে"।
(তানযীমুল আশ্‌তাত, খন্ড-১, পৃঃ-৪১)

(১৪) “একটি শহরের চাঁদ দেখা অন্য শহরের জন্য যথেষ্ঠ হবে, দুই শহরের মাঝের দূরত্ব কোন ব্যাপার নয়, শরয়ী পদ্ধতিতে সংবাদ পৌঁছালে প্রাচ্যবাসীর চাঁদ দেখা পশ্চিমাবাসীর জন্য যথেষ্ঠ হবে, অনুরূপভাবে বিপরীত (পশ্চিমাবাসীর চাঁদ দেখা প্রাচ্যবাসীর জন্য যথেষ্ঠ)”
(দুররে মুখতার, ‘রদ্দুল মুখতার’) (ইলমুল ফিকাহ খন্ড-৩, পৃ: ১৭, ১৮)

(১৫) চার মাযহাবের সমন্বিত ফিকহ গ্রন্থ "আল ফিকহ আলা মাযাহিবিল আরবায়া" নামক গ্রন্থের ভাষ্য হচ্ছে-

"পৃথিবীর কোন এক প্রান্তে চাঁদ দেখা প্রমাণিত হলে সকল স্থানেই উক্ত দেখার দ্বারা রোযা ফরয হবে । চাই চাঁদ নিকটবর্তী দেশে দেখা যাক বা দূরবর্তী দেশে দেখা যাক এতে কোন পার্থক্য নেই । তবে চাঁদ দেখার সংবাদ গ্রহণযোগ্য পদ্ধতিতে অন্যদের নিকট পৌছতে হবে । তিন ইমাম তথা ইমাম আবু হানীফা রহমাতুল্লাহি আলাইহি, ইমাম মালেক রহমাতুল্লাহি আলাইহি এবং ইমাম আহমদ ইবনু হাম্বল রহমাতুল্লাহি আলাইহি-এর মতে চাঁদের উদয়স্থলের ভিন্নতা গ্রহণীয় নয় । অর্থাৎ প্রথম দিনের দেখার দ্বারাই সর্বত্র আমল ফরয হয়ে যাবে"
(আল ফিকহ আলা মাযাহিবিল আরবায়া, খন্ড-১, পৃঃ-৪৪৩) অথবা (আল ফিকহ আলা মাযাহিবিল আরবায়া, খন্ড-১, পৃঃ-৮৭১)

(১৬) বিশ্ব মানের ফিকহ গ্রন্থ আল ফিকহুস্ সুন্নাহ এর সিদ্ধান্ত হচ্ছে-

“ জমহুর ফুকাহা গনের সিদ্ধান্ত হচ্ছে চাঁদের উদয়স্থলের ভিন্নতা গ্রহণীয় নয়। অতএব যখনই কোন দেশে চাঁদ দেখা প্রমাণিত হবে তখনই অন্য সকল দেশে রোযা ফরয হয়ে যাবে। কেননা রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম এরশাদ করেছেন “চাঁদ দেখার প্রমাণ সাপেক্ষে তোমরা রোযা রাখ এবং চাঁদ দেখার প্রমাণ সাপেক্ষে তোমরা রোযা ছাড়, ঈদ কর”। এখানে তোমরা বলে সম্বোধন দেশ মহাদেশ নির্বিশেষে সকল উম্মতের জন্য عام ব্যাপক অর্থবোধক। অতএব উম্মতের মধ্য থেকে যে কেউ যে কোন স্থান থেকে চাঁদ দেখুক উক্ত দেখাই সকল উম্মতের জন্য দলীল হবে। এ মত পোষণ করেছেন হযরত ইকরামা, কাসেম ইবনে মুহাম্মাদ, সালেম এবং ইসহাক রহমাতুল্লাহি আলাইহিম। হানাফী ফকীহগণের এটাই বিশুদ্ধমত”।
(আল-ফিকহুস্ সুন্নাহ, খন্ড-১, পৃঃ-৩০৭) অথবা (আল-ফিকহুস্ সুন্নাহ, খন্ড-২, পৃঃ-৭)


কেন এই বৈষম্য? আরব ও বাংলাদেশের সিয়াম ও ঈদের পার্থক্য কেন?



 আরব ও বাংলাদেশে সিয়াম ও ঈদে একদিনের ব্যাবধান কেন?

ইন্নালহামদু লিল্লাহ! নাহ্‌মাদুহূ ওয়া নাস্তা'ঈনুহূ ওয়া নাস্তগ্‌ফিরুহূ ওয়ানু'মিনুবিহী ওয়ানাতাওয়াক্কালু আলায়হি, ওয়া না'উযু বিল্লাহি মিন শুরুরি আনফুসিনা ওয়ামিন সাইয়্যেআতি আ'মালিনা মাইয়্যাহ্‌দিহিল্লাহ্‌ ফালা মুযিল্লালাহূ ওয়া মাইয়্যুযলিল্‌হু ফালা হাদিয়ালাহূ। ওয়া আশহাদু আল্লাইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকালাহ্ - ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আব্দুহু ওয়া রাসুলুহু। আম্মা বা'দ। ফাআ'উযু বিল্লাহি মিনাশ শায়ত্বানির রাজীম।
সর্বশক্তিমান আল্লাহ্‌ সুবহানওয়াতলা'র মহান দরবারে লাখো শুক্রিয়া জ্ঞাপন করছি যিনি আমাদের ইসলামের সত্যটা নির্ভয়ে প্রচারণার তাউফিক এনায়েত করেছেন, আলহামদুলিল্লাহ্‌। আমরা যারা বাংলাদেশি তারা জন্মের পড় থেকেই ঈদ বলতে জেনে আসছি যে, সৌদিআরবে রমজান মাস শুরু হওয়ার পরদিন আমাদের দেশে রমজান মাস শুরু হয় বা সৌদিআরবে ঈদ হওয়ার পরদিন আমাদের দেশে ঈদ হয়। এটি আমাদের দেশের জন্য একটি চিরন্তন সত্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। চাঁদ দেখা যেক আর না যাক, সৌদি আরবের পরের দিন আমাদের ঈদ হয়ে থাকে এটাই জেনে এসেছি। আবার আমাদের ঈদ পালনের একদিন পর পাকিস্তানে ঈদ হয় বা রমজান মাস শুরু হয়। এই আলাদা দিন ও চাঁদ নিয়ে বিভ্রান্তি শুধু আমাদের দেশেই নয় বরং গোটা বিশ্বেই চালু আছে।
কিন্তু একবারও কি ভেবে দেখেছেন কেন এই বৈষম্য? কেন আমরা তাদের চেয়ে একদিন পরে রমজান পাবো? কেন একদিন পরে ঈদ পালন করবো?
আমরা এখানেই সেটাই তাহকিক করব।
প্রথমেই আসুন আমরা চাঁদ আর সূর্য সম্পর্কে জানি।
চাঁদ হলো পৃথিবীর একমাত্র উপগ্রহ। চাঁদের বয়স প্রায় ৪৫০ কোটি বছর। এটি পৃথিবীর চারিদিকে একবার আবর্তন (পৃথিবীর নিজ অক্ষে আবর্তনের সময়ের সমান) করতে সময় নেয় ২৩ ঘণ্টা ৪৮ মিনিট ৪৭ সেকেন্ড এবং পৃথিবীর সাথে সামনাসামনি হয় ২৯.৫ দিনে। একে চন্দ্রমাস বলে হয়। ভৌগলিক গবেশনার ফলাফল হলো প্রতি আরবি মাসের এক তারিখে চাঁদ সর্বপ্রথম মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মাঝে দেখা যাবে কারন চাঁদ পশ্চিম দিকে উদয় হয় এবং পুর্ব দিকে অস্ত যায়। আরব হলো মধ্যপ্রাচ্য ফলে চাঁদ উঠলে প্রথমে তা আরবে দেখা যায়। ঠিক একই বিপরীত কারনে সূর্য যেহেতু পুর্ব দিকে উদয় হয় এবং পশ্চিম দিকে অস্ত যায় তাই পুর্ব দিকে থাকার কারনে প্রথম সূর্যউদয় দেখা যায় জাপানে।
বিজ্ঞানের কল্যানে আমরা জানি যে চাঁদ কেবল রাতেই ওঠেনা বরং দিনেও ওঠে। প্রথম তারিখের চাঁদ সর্বপশ্চিমে সূর্যাস্তের ৪৯ মিনিট পরে চাঁদ অস্ত যায়। এই ৪৯ মিনিট কৌণিক ভাবে সূর্যের আলো চাঁদের ভূপৃষ্ঠে প্রতিফলিত হয় তাই চাঁদের যে অংশে আলো পড়ে তার সামান্য অংশ আমাদের চোখের সামনে ধরা পড়ে। তখন আরবি মাসের নতুন চাঁদ আমরা সূর্যাস্তের পরপরই সন্ধায় দেখি যার স্থায়িত্বকাল হয় মাত্র ৪৯ মিনিট। অর্থাৎ নতুন চাঁদ সূর্যাস্তের পর ৪৯ মিনিট দেখা যায় এরপরে তা পশ্চিমা দেশ থেকে ধীরে ধীরে সরে যায় এক্সময় অদৃশ্য হয়ে যায়।
দ্বিতীয় দিন আবার চাঁদ ও সূর্যের গতিভেদে তারা পরদিন ৪৯ মিনিট পর মিলিত হয় ফলে পরদিন চাঁদ দেখা যাবে ৪৯+৪৯=৯৮ মিনিট। এবং চাঁদের উদয়স্থান পরিবর্তন হয়ে যায়। এভাবে প্রতিদিন চাঁদের স্থায়িত্বকাল ৪৯ মিনিট করে বাড়তেই থাকে এবং ২৯ দিন চাঁদকে ২৯ স্থানে উদয় হতে দেখা যায়।
সূর্য আমাদের সৌরজগতের একটি জ্যোতিষ্ক। যারা আলোক বিকিরন করে তারাই জ্যোতিষ্ক। আর যাদের নিজের আলো আছে তারা নক্ষত্র, আর যাদের নাই তারা গ্রহ বা উপগ্রহ। আমাদের সূর্য মূলত একটি বামুনে তারকা (Teen Star). এটি একটি জলন্ত অগ্নিপিন্ড এবং এর উপাদান ৬৬ ভাগই হাইড্রোজেন। আগে ধারনা করা হতো সূর্য স্থির কিন্তু কোরআন এবং আধুনিক বিজ্ঞানের কল্যানে আমরা এখন জানি সূর্য স্থির নয়, প্রায় ২০ কোটি বছরের ব্যাবধানে এটি একবার আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি পরিভ্রমন করে। আবার পৃথিবীও সূর্যকেন্দ্রিক হওয়াতে এটি ৩৬৫ দিন ৬ ঘণ্টায় একবার সূর্যকে প্রদক্ষিন করে। একে সৌরবছর বলা হয়।
সূর্য ও চাঁদের কাজ কি?
আল্লাহ্‌ সুবহানওয়াতাআলাহ কোন কিছু অনর্থক সৃষ্টি করেননি, তিনি সূর্য ও চাঁদকে কেন সৃষ্টি করেছেন তা স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছেন।
আল্লাহ্‌ সুবহানওয়াতাআলাহ বলছেন সুরা রাহমান এর ৫ নং আয়াতে, 'সূর্য এবং চন্দ্র উভয়েই সময় নির্দেশক হিসেবে রয়েছে'।
অর্থাৎ এসব বিরাট নক্ষত্র, গ্রহ-উপগ্রহ একটা অত্যন্ত শক্তিশালী নিয়মবিধি ও অপরিবর্তনীয় শৃংখলার বাঁধনে আবদ্ধ। মানুষ সময়, দিন, তারিখ এবং ফসলাদিও মওসূমের হিসেব করতে সক্ষম হচ্ছে এ কারণে যে, সূর্যের উদয়াস্ত ও বিভিন্ন রাশি অতিক্রমের যে নিয়ম কানুন নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে তাতে কোন সময়ই কোন পরিবর্তন হয় না। পৃথিবীতে অসংখ্য জীব-জন্তু বেঁচেই আছে এ কারণে যে, চন্দ্র ও সূর্যকে ঠিকমত হিসেব করে পৃথিবী থেকে একটি বিশেষ দূরত্বে স্থাপন করা হয়েছে এবং একটি সঠিক মাপ জোকের মাধ্যমে বিশেষ শৃংখলার সাথে এ দূরত্বের হ্রাস বৃদ্ধি ঘটে। কোন হিসেব নিকেশ ও মাপজোক ছাড়াই যদি পৃথিবী থেকে এদের দূত্বের হ্রাস বৃদ্ধি ঘটতো তাহলে কারো পক্ষেই এখানে বেঁচে থাকা সম্ভব হতো না। অনুরূপভাবে পৃথিবীর চারদিকে চন্দ্র ও সূর্যের গতি বিধিতে এমন পূর্ণ ভারসাম্য কায়েম করা হয়েছে যে, চন্দ্র একটি বিশ্বজনীন পঞ্জিকায় রূপান্তরিত হয়েছে যা অত্যন্ত নিয়মতান্ত্রিকভাবে প্রতিরাতে সমগ্র বিশ্বকে চান্দ্র মাসের তারিখ নির্দেশ করে দেয়।
আরও রয়েছে সুরা ইউনুসের ৫ নং আয়াতে,
'তিনিই সূর্যকে করেছেন দীপ্তিশালী ও চন্দ্রকে আলোকময়, এবং তার মনযিলেও ঠিকমত নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন যাতে তোমরা তার সাহায্যে বছর গণনা ও তারিখ হিসেব করতে পারো৷ আল্লাহ এসব কিছু (খেলাচ্ছলে নয় বরং )উদ্দেশ্যমূলকভাবেই সৃষ্টি করেছেন তিনি নিজের নিদর্শনসমূহ বিশদভাবে পেশ করেছেন যারা জ্ঞানবান তাদের জন্য৷' আরও রয়েছে সুরা বাকারাহ এর ১৮৯ আয়াতে, 'হে রাসুল, আপনাকে মানুষ চন্দ্র ও সূর্যের কারন জানতে চাইলে তাদের বলে দিন এগুলো মানুষের জন্য সময় নির্ধারক এবং হজের সময় নির্ধারনকারী'।
এথেকে বোঝা যায়, সূর্য এবং চন্দ্র আমাদের কেবল আলোই দেয়না বরং আমাদের সময় নির্ধারক হিসেবেও কাজ করে।
বিভিন্ন আলেম ও ইসলামী গবেষকরা এই বিষয়ে একমত যে, চাঁদ হলো মাস ও তারিখের জন্য আর সূর্য সময় অর্থাৎ ঘণ্টা মিনিটের জন্য।
এখন আসুন, সৌদি আরবের সাথে বাংলাদেশের তারিখের পার্থক্যের কারন দেখা যাক।
যারা সৌদিআরবের একদিন পরে হিসাব শুরু করে তাদের ভাষ্যমতে, আরবে একদিন আগে চাঁদ দেখা যায় তাই ওরা একদিন আগে রমজান বা ঈদ পায় আর আমরা একদিন পরে চাঁদ দেখি তাই আমরা একদিন পরে রমজান পাই এবং ঈদ পাই।
তাদের একটি গানিতিক যুক্তিও আছে... আরব বাংলাদেশের চেয়ে ১০০ কিলোমিটার উঁচুতে রয়েছে।
১। আরবে যেদিন জুমুআ বার সেদিন আমাদের দেশেও জুমুআ বার, অর্থাৎ একইদিনেই জুমুআর সালাত আদায় করা হয়। চন্দ্রমাসে যদি একদিন পার্থক্য হতো তাহলে আরবের সাথে আমাদের জুমুআ তারিখ এক হয় কেন?
আরবেও যেদিন শুক্রবার আমাদের দেশেও সেদিন শুক্রবার হয় কেন?
অনেকে বলে 'আরবের সাথে একসাথে নামাজ পড়েন না কেন?'
এক্ষেত্রে তাদের বিজ্ঞান পড়ার আহবান জানাচ্ছি। কারন আগেই উল্লেখ করেছি যে সময়ের হিসাব করে সূর্য। যেহেতু এক সৌরদিনে সূর্য এক এক সময় এক এক স্থানে থাকে তাই ঐ সময়ের সাপেক্ষে নামাজের সময় হয়। সূর্যের হিসাব নিয়ে আমাদের আপত্তি নাই, আমাদের আপত্তি কেবল চন্দ্রের হিসাব নিয়ে।
নামাজ সময়ের ব্যাপার। সুবেহ সাদিকের সময় ফজর, আমরা সাড়ে তিন ঘণ্টা পরে ফজর পাই। আবার সূর্য ঠিক মাথার ওপরে থাকলে তারা যোহর পায় এবং আমাদের মাথার ওপরে আসলে আমরা যোহর পাই, সেটা সাড়ে তিন ঘণ্টা পরে আসে। তাই নামাজের পার্থক্য কেবল সাড়ে তিন ঘণ্টা।
এই সূর্যের পার্থক্যের কারনেই ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, সিলেট একসাথে ইফতার (মাগরিব) ও সাহরি (ফজর) পায়না, কয়েক মিনিট সময়ের পার্থক্য হয়। কিন্তু একই দিনে সারা বাংলাদেশে তা সংঘটিত হয়ে থাকে। আরব ও বাংলাদেশের ব্যাপারটাও সেরকম হওয়ার কথা কিন্তু আমাদের বিশ্বের একটি জাগতিক ভুলের কারনে আজ আমরা বিভ্রান্ত।
২। ধরুন আপনি আরব থাকেন, এখন রমজান মাস শুরু হওয়ার পর আপনি কোন এক তারিখে বিমানে করে দেশে ফিরে আসলেন। এখন যেহেতু বাংলাদেশে একদিন পরে সাওম শুরু হয়েছে তাই আপনি হিসেব অনুযায়ী একটা সাওম বেশি পাবেন। কিন্তু ঐ চন্দ্রমাস যদি ৩০ দিনের হয়ে থাকে তাহলে আপনি মোট পাবেন ৩০+১=৩১ টি সাওম।
আবার আপনি দেশ থেকে রমজানের কোন এক তারিখে বিমানে করে আরবে ফিরে যান তাহলে আপনি হিসেব অনুযায়ী একটা সাওম কম পাবেন। আর ঐ চন্দ্রমাস যদি ২৯ দিনের হয় তাহলে আপনার সাওম হবে ২৯-১=২৮ টি।
কিন্তু রমজানের সাওম ২৯ অথবা ৩০ না হলে ঐ সাওম গ্রহনযোগ্য হবেনা।
আয়েশা রাঃ হতে বর্নিত যে, চাঁদ দেখা গেলে রাসুল সাঃ ২৯ দিন সাওম রাখতেন এবং আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকলে (বা চাঁদ না দেখা গেলে) ৩০ দিন পুর্ন করতেন। (সুনানে আবু দাউদ হাদিস নাম্বার ২৩২৭-২৩২৮, আহমদ ২৫৮৬১, বায়হাকি ৮১৯৩)
সুতরাং ২৯ অথবা ৩০ ব্যাতিত সাওম গ্রহণযোগ্য নয়। এক্ষেত্রে আরব হতে আসা প্রবাসি ভাই এবং বিদেশ গমনকারী ভাইয়ের সাওম কি হবে?
কখনই না, বিশ্বব্যাপী এই ভিন্নতার কারনে এই সমস্যা।
৩। 'লাইলাতুল কদর' অর্থাৎ কুরআন নাজিলের রাত্রি একটি। তাঁর দলিল আল্লাহ্‌ নিজেই কুরআনে বলেছেন 'ইন্না আনজালনাহুফি লাইলাতিল কদর' অর্থ 'আমি নিশ্চয় কুরআন নাজিল করেছি কদরের রাত্রিতে'। যেহুতু এখানে একটিমাত্র লাইলাতুল কদরের কথা উল্লেখ্য করা হয়েছে সুতরাং লাইলাতুল কদর অবশ্যই একটা।
আর এখন লাইলাতুল কদর যদি একটা হয় তাহলে কোন রাতে কুরআন নাজিল হয়েছে?
আরবের হিসেবে লাইলাতুল কদর? নাকি বাংলাদেশের হিসেবে লাইলাতুল কদর?
৪। হাদিসে বলা হয়েছে মহরম মাসের ১০ তারিখ কেয়ামত হবে। যেহেতু মহরম আরবি মাস সুতরাং অবশ্যই সেটা চন্দ্রমাস। আর চন্দ্রমাস হলে আমাদের তো পার্থক্য থাকবে একদিন (বর্তমান হুজুরদের ভাষ্যমতে)। তাই যদি হয় তাহলে আরবে একদিন আগে কেয়ামত শুরু হবে আর আমরা টিভি তে সরাসরি দেখবো কারন তখন তো আমাদের দেশে কেয়ামত আসবেনা। বাংলাদেশ একদিন পরে কেয়ামত শুরু হবে।
প্রথমদিন আরবে কেয়ামত শুরু হলে তারা বাংলাদেশে মোবাইল ফোনে জানিয়ে দিবে 'আরবে কেয়ামত হচ্ছে তোমরা তাউবা করো'। তখন সাথে সাথে আমরা তাউবা করবো এতে কেয়ামত থেমে যাবে কারন আল্লাহ্‌র ওয়াদাহ হলো একজন বান্দাও আল্লাহকে স্মরণ করলে আল্লাহ্‌ কেয়ামত দেবেন না।
চন্দ্রমাসে একদিনের পার্থক্যের কারনে কেয়ামত কি একদিন আগে পরে হবে নাকি একসাথে?
যদি একসাথেই হয় তাহলে সিয়াম এবং ঈদে কেন এই বৈষম্য??
এই একদিন পার্থক্যের কারনে আমাদের বিশাল কিছু সমস্যা হচ্ছে। নিচে তা তুলে ধরা হলো,
১। যেহেতু সারা বিশ্বে একসাথেই সিয়াম ও ঈদ পালনই সহিহ তাই কেউ যদি বাংলাদেশের নিয়মে সিয়াম শুরু হয় তাহলে আরবে যেদিন ঈদ (মূলত আমাদেরও ঈদ) সেদিন আমাদের ৩০ রমজান পড়ে যায়।
আর ঈদের দিনে রোযা রাখা হারাম, তাই আমরা না জেনে 'শুকরের মাংস' খাওয়ার মতই একটা হারাম কাজে লিপ্ত হচ্ছি।
২। আবার একই ভাবে, ঈদ-লু-আযহাতে ইয়ামুল আরাফার পুর্বে অনেকে নফল রোযা রাখেন। কিন্তু সেটা ঈদের দিন পড়ে যায়। একটি নফল পালন করতে গিয়ে একটি হারামে লিপ্ত হচ্ছি।
৩। গত ২ নাম্বার পয়েন্টে উল্লেখিত হয়েছে, প্রবাস ফেরত ভাই এবং বিদেশ গমনকারি ভাইয়ের মত হাজারো দেশান্তরিত ব্যাক্তির সাওম পালনে সমস্যা হচ্ছে।
৪। আল্লাহও বলছেন, 'লাইলাতুল কদর খইরুমমিন আলফিশাহর' অর্থ 'লাইলাতুল কদর বা কদরের রাত্রি হাজার মাসের চেয়েও উত্তম'। আর আলাদা দিনে লাইলাতুল কদর খোঁজার কারনে আমরা সঠিক তারিখের পরদিন অর্থাৎ 'জোড়' তারিখে লাইলাতুল কদর অন্বেষণে ব্যাস্ত হয়ে পড়ছি। ফলে প্রকৃত বিজোড়ের রাত্রির লাইলাতুল কদর পাচ্ছিনা। হাজার মাসের চেয়ে উত্তম রাত্রিই পাচ্ছিনা তাহলে এ জীবনে আর কি পেলাম? কি মুল্য এই জীবনের?
৫। পবিত্র রমজান মাস শুরু হলেই সকল যোগ্যে মুস্লিমের সাওম রাখা ফরজ, ইচ্ছাকৃতভাবে সাওম না রাখা হারাম। সঠিক হিসেবে আরবে রমজান মাস শুরু হওয়ার ঘটনা শুনেও আমরা সাওম না রেখে আরও একদিনের অপেক্ষা করে হারামে লিপ্ত হচ্ছি।
৬। হজের দিন ফজর থেকে 'ইয়ামুল আরাফা' তাকবীর বলা ওয়াজিব অথচ একদিন পার্থক্যের জন্য আমরা টিভিতে হাজীদের সরাসরি দেখার পরেও তাকবীর না পড়ে চুপচাপ থেকে ওয়াজিব পালনে গাফেলতি দেখিয়ে গুনাহগার হচ্ছি।
৭। আবার জিলকদ মাসের কুরবানি করতে হয় ১০, ১১, ১২ তারিখে। অথচ আমাদের নিকট ১২ তারিখ মূলত ১৩ই জিলকদ, ফলে আমাদের শেষদিনের কুরবানি সহিহ হচ্ছেনা। ফলে সেদিন কেবল গোশত খাওয়াই হচ্ছে, আল্লাহ্‌র ওয়াজিব আদায় হচ্ছেনা।
৮। একদিন পরে সিয়াম শুরু করার কারনে যেমন প্রথম রোযা ছুটে গিয়ে ফরজ হারাচ্ছি তেমনি ৩০ রোযার (আরবে ঈদ) দিনে রোযা রেখে হারামে নিমজ্জিত হচ্ছি। আবার দুই ধারের দুটি ফরজ ছুটে গিয়ে মাঝখানের ৩০ টি রোযার মাত্র ২৮ টি পালন হচ্ছে ফলে আমাদের সিয়াম, ঈদ তো হচ্ছেইনা বরং হারামে নিমজ্জিত হয়ে পাপী হচ্ছি।
৯। শুধু সিয়াম ও ঈদ-উল-ফিতর নয় বরং ঈদ-উল-আযহা, আশুরা, লাইলাতুল কদর, লাইলাতুল মিরাজ ইত্যাদির কোনটাই আমরা সঠিকভাবে পাইনা।
এর ফায়সালা কি?
এর একটাই ফায়সালা, একই সূর্যের ভিত্তিতে সারাবিশ্বে যেমন একই খ্রিস্টাব্দ চলে তেমনি একই চাঁদের ভিত্তিতে সারাবিশ্বে একই সাথে সিয়াম ও ঈদ পালন করা জরুরী। নতুবা আমাদের অনেক সমস্যা হচ্ছে। রাসুলের সুন্নাহ বাদ দিয়ে আআজ আমরা পৃথিবীর শাসন মেনে নিয়েছি ফলেই আমরা না বুঝেই একটি বিরাট পাপে পাপী হচ্ছি। একই চাঁদে সকল বিশ্বের হিজরি তারিখ গননা হবে এটা সকল ইমামগনের ফতোয়ার কিতাবে রয়েছে, নিচে তা তুলে ধরা হলো।
ইমাম আন-নাসাফী (মৃ: ৭০১ হি) বলেন: ﻭَﻳَﻠْﺰَﻡُ ﺃَﻫْﻞَ ﺍﻟْﻤَﺸْﺮِﻕِ ﺑِﺮُﺅْﻳَﺔِ ﺃَﻫْﻞِ ﺍﻟْﻤَﻐْﺮِﺏِ পূর্বের বাসিন্দাদের (চাঁদ) দেখা পশ্চিমের বাসিন্দাদের উপর আরোপিত হবে। [বাহরুর রায়েক শরহু কানযিদ দাকায়েক, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ১৮০]
ফাতওয়ায়ে ইবনু তাইমিয়্যা গ্রন্থের বলা হচ্ছে- ﻳﺸﻤﻞ ﻛﻞ ﻣﻦ ﺑﻠﻐﻪ ﺭﺅﻳﺔ ﺍﻟﻬﻼﻝ ﻣﻦ ﺍﻯ ﺑﻠﺪ ﺍﻭ ﺍﻗﻠﻴﻢ ﻣﻦ ﻏﻴﺮ ﺗﺤﺪﻳﺪ ﻣﺴﺎﻓﺔ ﺍﺻﻼ অর্থাৎ নব চাঁদ উদিত হওয়ার সংবাদ যতটুকু পৌঁছবে ততটুকু তার আওতাভূক্ত হবে। তা কিছুতেই দূরত্বের কারণে কোন দেশ, মহাদেশ বা অঞ্চলেসীমাবদ্ধ থাকবে না। [ফাতওয়ায়ে ইবনু তাইমিয়্যা, খন্ড-২৫, পৃঃ-১০৭] অথবা [তামামুল মিন্নাহ ১/৩৯৮]
"পৃথিবীর কোন এক প্রান্তে চাঁদ দেখা প্রমাণিত হলে সকল স্থানেই উক্ত দেখার দ্বারা রোযা ফরয হবে । চাঁদ নিকটবর্তী দেশে দেখাযাক বা দূরবর্তী দেশে দেখা যাক এতে কোন পার্থক্য নেই । তবে চাঁদ দেখার সংবাদ গ্রহণযোগ্য পদ্ধতিতে অন্যদের নিকট পৌছতে হবে । তিন ইমাম তথা ইমাম আবু হানীফা রহমাতুল্লাহি আলাইহি,ইমামমালেক রহমাতুল্লাহি আলাইহি এবং ইমাম আহমদ ইবনু হাম্বল রহমাতুল্লাহিআলাইহি-এর মতে চাঁদের উদয়স্থলের ভিন্নতা গ্রহণীয় নয় । অর্থাৎ প্রথম দিনের দেখার দ্বারাই সর্বত্র আমল ফরয হয়ে যাবে"(আল ফিকহ আলা মাযাহিবিল আরবায়া, খন্ড-১, পৃঃ-৪৪৩)
ফতওয়া-ই আলমগিরি'-তে বলা হয়েছে, لَوْ رَأَى أَهْلُ مَغْرِبٍ هِلَالَ رَمَضَانَ يَجِبُ الصَّوْمُ عَلَى أَهْلِ مَشْرِقٍ "পৃথিবীর পশ্চিম প্রান্তের অধিবাসীদের কেউরমজানের চাঁদ দেখলে পৃথিবীর পূর্ব প্রান্তের অধিবাসীদের ওপরও ওই রোজা ফরজ হবে।"
নব চাঁদ উদিত হওয়ার সংবাদ যতটুকু পৌঁছবে ততটুকু তার আওতাভূক্ত হবে। তা কিছুতেই দূরত্বের কারণে কোন দেশ, মহাদেশ বা অঞ্চলেসীমাবদ্ধ থাকবে না। (ফাতওয়ায়ে ইবনু তাইমিয়্যা, খন্ড-২৫, পৃঃ-১০৭, তামামুল মিন্নাহ ১/৩৯৮)
পবিত্র বুখারী শরীফের ব্যাখ্যা গ্রন্থ বিশ্ব বিখ্যাত কিতাব “ফাতহুল বারী”-তেআল্লামা ইবনু হাজার আল-আসকালানীরহমাতুল্লাহি আলাইহি লেখেন- "রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বাণী فلاتصوموا حتى تروه [রোজারেখ না যতক্ষন না (নতুন চাঁদ) দেখছ] এর মাধ্যমে প্রত্যেক ব্যক্তি নিজে চাঁদ দেখতে হবে এমন উদ্দেশ্য নেয়া যাবেনা। বরং পবিত্র বাণীটির উদ্দেশ্য হচ্ছে কিছু ব্যক্তির চাঁদ দেখা। জমহুর ফকীহ গণের মতানুসারে রমযানের চাঁদ একজনের দেখাই যথেষ্ট হবে। যা হানাফী ফকীহগণের মত। আর অন্যদের মতে দু’জনের দেখা যথেষ্ট হবে। এ মতামতঅপরিচ্ছন্ন আকাশের ক্ষেত্রে, কিন্তু আকাশ যদি পরিচ্ছন্ন থাকে তাহলেএমন সংখ্যক ব্যক্তির চাঁদদেখতে হবে যাদের সংখ্যা দ্বারা চাঁদ দেখার সংবাদ প্রমাণিত হবে। যারা এক দেশের দেখা অন্য দেশের জন্য প্রযোজ্য বলে মত প্রকাশ করেছেন এটা তাদের মত। আর যারা প্রত্যেক দেশের জন্য চাঁদ দেখার মতপ্রকাশ করেছেন তারা বলেছেন “যতক্ষণ না তাকে দেখবে” এর মাধ্যমে বিশেষ অঞ্চলের মানুষকে সম্বোধন করা হয়েছে। যা অন্য অঞ্চলের মানুষের জন্য প্রযোজ্য নয়। কিন্তু দ্বিতীয় পক্ষের এ মত হাদীসের প্রকাশ্য বক্তব্যের পরিবর্তন। অতএব চাঁদ দেখাকে প্রত্যেক মানুষের সাথে এবং প্রত্যেক দেশের সাথে সীমিত করা যাবে না।" [ফাতহুল বারী ফি শরহে ছহীহীল বুখারী, খন্ড-৪, পৃঃ-১৫৪]
সবচেয়ে গুরুত্বের বিষয় হলো, রাসুল বলেছে 'তোমরা চাঁদ দেখে রোযা রাখো, চাঁদ দেখে রোযা ছাড়ো'। এখানে তোমরা মানে বাংলাদেশের তোমরা কিংবা সৌদির তোমরা আলাদা নয়, বরং এখানে সকল উম্মাহকেই বুঝানো হয়েছে। তাই একই চাঁদের ভিত্তিতে সকল উম্মাহকে সিয়াম রাখতে হবে, এটা ফরজ।
কিছু প্রশ্নোত্তর-
# রাসুল সাঃ কীভাবে সাওম রাখতেন?
- হাদিসে এসেছে, রাসুল সাঃ চাঁদ দেখে সাওম রাখতেন এবং চাঁদ দেখে সাওম ভঙ্গ করতেন।
আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রাঃ হতে বর্নিত রাসুল সাঃ ইরশাদ করেছেন যে, তোমরা যখন চাঁদ দেখবে তখন সাওম রাখবে এবং আবার চাঁদ দেখবে তখন সাওম ভাঙ্গবে (ঈদ করবে)। যদি মেঘাচ্ছন্নের কারনে চাঁদ না দেখা যায় তাহলে ৩০ দিন পুর্ন করো। (সহিহ আল বুখারি হাদিস নাম্বার ১৯০০, সহিহ মুসলিম ২৫৫৬)। এছাড়াও আরও রয়েছে সহিহ আল বুখারি ৯০৯, সহিহ মুসলিম ২৫৬৭, আত তিরমিজি ৬৮৪ ইত্যাদি।
যারা একদিন আগে পরে পালনের পক্ষে তারা এই হাদিস তুলে ধরে বলে 'এখানে আমাদের চাঁদ দেখে রওজা রাখতে বলে হয়েছে তাই আমরা সৌদিআরবের একদিন প্রে চাঁদ দেখি তাই আমরা একদিন পরে রমজান পাই'।
কিন্তু এখানে রাসুল সাঃ এর হাদিসে 'মেঘাচ্ছন' কথাটি উল্লেখ থাকা একটি বিশাল অর্থ বহন করে। মেঘাচ্ছন্নের কারনে দেখা না গেলে সাওম রাখা যাবেনা, এখান থেকে দুইটি শিক্ষা পাই আমরা।
১। মেঘাচ্ছন থাকলেও আজকের আধুনিক যন্ত্রপাতি দিয়ে চাঁদ দেখা যায় কিন্তু এখানে মেঘাচ্ছন্ন না থাকলে সাওম রাখা হতে বিরত থাকার কথা বলার কারনে বোঝা যায় যে মেশিন দ্বারা দেখলে চল্বেনা বরং চর্মচক্ষু দিয়ে দেখতে হবে। আনুমান নির্ভর কাজ করা যাবেনা।
২। 'তোমরা' বলতে রাসুল কি বুঝিয়েছেন?
'আরবের তোমরা', 'বাংলাদেশের তোমরা', 'ভারতের তোমরা' এভাবে? নাকি সমগ্র মুসলিম জাতিকে?
হাদিসে কোথাও বলা নেই যে 'যে অঞ্চল থেকে চাঁদ দেখা যাবে সেই অঞ্চলে রমজান বা ঈদ আর বাঁকি অঞ্চলগুলোতে নয়'।
আপনাদের প্রতি ওপেন চ্যালেঞ্জ এধরনের কোন সহিহ হাদিস তো দুরের কথা জঈফ হাদিসও দেখাতে পারবেন না। কারন এখানে 'তোমরা চাঁদ দেখ' অর্থ সবাইকে চাঁদ দেখার কথা বলা হয়েছে। (অবশ্য অন্ধ ও অসুস্থকে নয়)।
সুতরাং সবাইকে চাঁদ দেখতে হবে, কিন্তু 'যে স্থান থেকে চাঁদ দেখা যাবে সেখানে রমজান বা ঈদ' এধরনের বিভ্রান্তি সরাতে হবে। কারন রাসুল সাঃ এর শাসনামলে পৃথিবীতে এতো দেশ ছিলনা, এগুলো পরবর্তিতে যুদ্ধ বিগ্রহের মাধমে সৃষ্টি হয়েছে। রাসুলের আমলে এবং সাহাবীদের সময় সারা পৃথিবী চলতো এক শাসনের অধিনে। তাই তখন পৃথিবীর যে স্থানেই চাঁদ দেখা যেত (মূলত আরবেই প্রথমে দেখা যায়) দুজন সাক্ষির গোচরে সারা বিশ্বেই একসাথে রমজান ও ঈদ পালন করা হতো।
# আরব ও বাংলাদেশের মাঝে ভৌগলিক পার্থক্য কি?
- আরব ও বাংলাদেশের মাঝে ভৌগলিক দূরত্ব অনুযায়ী সময়ের পার্থক্য ৩ ঘণ্টা ৩০ মিনিট কমবেশি হয়। অনেকে বলে থাকে আমাদের দেশে যখন দিন তখন আরবে রাত, এই কথাটি সম্পুর্ন ভুল এবং অযৌক্তিক কারন আমরা বিজ্ঞানের কল্যানে এখন জানি আরব ও বাংলাদেশের সময়ের পার্থক্য মাত্র সাড়ে তিন ঘণ্টা। সময়ের ক্ষেত্রে আরব আমাদের চেয়ে পিছিয়ে আছে কারন আমরা আরবের পুর্বে অবস্থিত, আবার একই কারনে আরবি সাল মানে হিজরির সময়মান তারিখের ক্ষেত্রে আমরা তাদের চেয়ে পিছিয়ে রয়েছি ১১ ঘন্টা ৩০ মিনিট কারব চাঁদ এবং সূর্য পরস্পর বিপরীত দিক হয়ে উদয় হয় এবং অস্ত যায়।
অর্থাৎ আরব ও বাংলাদেশের মাঝে 'সময়ের পার্থক্য সাড়ে তিন ঘণ্টা' এবং তারিখের পার্থক্য 'সাড়ে এগার ঘণ্টা'।
এখন আমাদের নিকট প্রমান রয়েছে যে বাংলাদেশ আর আরবের পার্থক্য এতই সামান্য যে একে ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে মাত্র সাড়ে এগার ঘণ্টার জন্য একটি পুর্নদিন অর্থাৎ ২৪ ঘণ্টা পিছিয়ে ফেলা হয়েছে, যা অত্যন্ত নির্মম।
# আরব যেদিন চাঁদ দেখে সেদিন আমরা দেখিনা কেন? বা আমরা আরবের পরদিন চাঁদ দেখি কেন?
- আগেই আলোচনা করা হয়েছে যে, চন্দ্রমাসের নতুন চাঁদ কেবল ৪৯ মিনিট স্থায়ী হয় ফলে সারাবিশ্বে সকল দেশে বা সকল স্থানে একই দিনে একই সাথে চাঁদ দেখা সম্ভব না। নতুন চাঁদ প্রতিটা এলাকা থেকে দেখতে হলে কমপক্ষে ২/৩ দিন লাগবে।
মাসের প্রথম দিকের তারিখে চাঁদ ও সূর্যের প্রায় মাঝামাঝি থাকে পৃথিবী তাই চাঁদের ভূপৃষ্ঠে পড়ে আলোর যে অংশ আমাদের পৃথিবীতে পৌছায় আমরা সেটাই দেখি শুকনো খেজুর ডালের মত। ৪৯ মিনিট পর চাঁদ কিন্তু ডুবে যায়না, বরং চাঁদ আকাশেই থাকে কিন্তু সূর্য বিপরীত অক্ষের দিকে চলে যাওয়ার কারনে চাঁদের ওপর সূর্যের প্রতিফলিত আলোকরশ্মি পৃথিবীর বাইরে পড়ার কারনে আমরা দেখতে পাইনা।
এভাবে ২/৩ দিন ধরে প্রতিফলিত রশ্মি পৃথিবীর বিভিন্ন এলাকায় পড়ার কারনে তারা ভিন্ন ভিন্নি দিনে নতুন চাঁদ দেখতে পায়।
একই ভাবে ব্যখ্যা দেইয়া যায়, আরবে যেদিন চাঁদ দেখা যায় সেদিন বাংলাদেশের ভৌগলিক অবস্থানের কারনে আমরা এই অক্ষ থেকে চাঁদ দেখতে পাইনা। প্রকৃতপক্ষে চাঁদ ঠিকই ওঠে কিন্তু আমরা দেখার আগেই তাঁর আলো পৃথিবীর ওপর থেকে সরে যায় তাই আমরা আরবের সাথে একই দিনে চাঁদ দেখতে পাইনা বরং পরদিন দেখতে পাই।
# আরবের সাথে রোযা করবো, নামাজ পড়বোনা কেন?
আগেই উল্লেখ্য করা হয়েছে যে সিয়াম হলো তারিখভিত্তিক বা চাঁদের ওপর নির্ভর করে। আর নামাজ সময়ভিত্তিক বা সূর্যের ওপর নির্ভর করে। হিজরির নতুন মাসের নিতুন চাঁদ বিশ্বের কোথাও দেখা গেলেই সেইদিন সারাবিশ্বে একই হিজরি তারিখ ঘোষণা হবে, সেদিন হবে চন্দ্রমাসের এক তারিখ। এভাবে আমরা একসাথে সারাবিশ্বে একই তারিখ পাই কিন্তু সময়ের সাড়ে তিন ঘণ্টা পার্থক্যের কারনে আমরা জুমুআর সালাত সাড়ে তিনঘণ্টা আগেই পড়ি। আমরা কিন্তু জুমুআর সালাত একই দিনে পড়ি, কিন্তু সময়ের তারতম্যের কারনে কেবল সাড়ে তিনঘণ্টা আগে।
ঠিক তেমনি সিয়াম ও ঈদ একই দিনে করতে হবে, যেমনটা হয় জুমুআ বার।
পরিশেষে একটা কথাই বলবো, সিয়াম কোন হেলাফেলার জিনিস নয়, এই আল্লাহ্‌র পক্ষে থেকে ফরজ। আর ইসলামের ৫ টি স্তম্ভের মধ্যে মাঝখানের শক্তি খুঁটি। আল্লাহ্‌ বলেছেন 'ইয়া আইয়্যুহাল্লাজিনা আমানু কুতবা আলাইকুমুস সিয়াম' অর্থ 'হে ইমানদারগণ, তোমাদের ওপর সিয়াম ফরজ করা হয়েছে...'। সুরা বাকারাহ, আয়াত নং ১৮৩। এছাড়াও রয়েছে সুরা বাকারাহ আয়াত নং ১৮৫। সিয়াম আল্লাহ্‌র ফরজ আর এর প্রতিদান আল্লাহ্‌ নিজেই দান করবেন এটা আল্লাহ্‌র প্রতিজ্ঞা, দলিলঃ সহিহ আল বুখারি হাদিস নাম্বার ৬৯৮৪, সহিহ মুসলিম ২৫৭৩, সুনানে আন নাসাঈ ২২১১, সুনানে আত তিরমিজি ৭৬১, সুনানে ইবনে মাজাহ ১৬৩৮।
তাই এত গুরুত্বপূর্ণ ফরজ একটা বিষয় নিয়ে 'বাপ দাদা এতদিন ধরে করে এসেছে এখন কি আর ছাড়তে পারি?' টাইপের মনোভাব দেখালে অনেক কিছুই ভুল করবেন।
আপনার সত্যটা জানার অধিকার রয়েছে, নিজে জানুন অন্যকে জানান। রাসুল সাঃ এর সময়ের মত সারাবিশ্বে একইদিনে সিয়াম ও ঈদ পালন জরুরী, নতুবা সিয়াম ঈদ কোনটাই পাবেন না।
আল্লাহ্‌ আমাদের সত্যটা জানার তাউফিক এনায়েত করুন, আমীন।
A Presentation of 'Fee Sabilillah' Publication .
* এই নোট এবং বিস্তারিত একটি বই আকারে প্রকাশ হয়েছে, আপনারা বইটি সংগ্রহে রাখতে পারেন। ফ্রি পিডিএফ মাত্র ১৪০ কিলোবাইট। 

 ডাউলোড করতে এখানে ক্লিক করুন -> https://www.copy.com/s/jlhogsp4qCe8/Why%20This%20Imparity%20By%20Shurjo%20Chowdhury.pdf














 ভারতের মুম্বাইয়ে রয়েছেন ডাঃ যাকির নায়েক, তিনিও বলেছেন সারাবিশ্বে একই দিনে সিয়ামের কথা!! ভাই এইডা কি কইলেন আমি তো... হইয়া গেলাম । দয়া কইরা নিচের ভিডিওটা দেইখা আসেন http://www.youtube.com/watch?v=Tp-cFOQX9Os    

 নিজ দেশের লোকদের সাথে রোযা রাখবে, না চাঁদ দেখা যে কোনো দেশের সাথে? (বাংলা)

 http://IslamHouse.com/308022 


শুক্রবার, ২ আগস্ট, ২০১৩

এক দিনে বিশ্বে রোযা, ঈদ, কুরবানী ইত্যাদি ইবাদাত পালন করা কীভাবে সম্ভব?

কুরআন, সুন্নাহ এবং ফিকহের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী একই দিনে সমগ্র বিশ্বে রোযা, ঈদ, কুরবানী ইত্যাদি ইবাদাত পালন করা কীভাবে সম্ভব?

24 June 2013 at 10:23
এক: যদি প্রশ্ন করা হয়, পৃথিবীর সকল জায়গায় একই সঙ্গে দিন ও রাত হয়না। বরং এক স্থানে যখন রাত অন্য স্থানে তখন দিন। তাহলে কুরআন, সুন্নাহ এবং ফিকহের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী একই দিনে সমগ্র বিশ্বে রোযা, ঈদ, কুরবানী ইত্যাদি ইবাদাত পালন করা কীভাবে সম্ভব?

জবাব: অত্র প্রশ্নের জবাবটি পরোপুরি ভৌগলিক জ্ঞানের সাথে সম্পৃক্ত। তাই এ প্রশ্নের জবাব জানার পূর্বে ভৌগলিক কিছু ধারণা অর্জন একান্তই দরকার। এ ক্ষেত্রে প্রথমেই জানা প্রয়োজন, প্রতি চান্দ্র মাসের নুতন চাঁদ সকল সময় পৃথিবীর কোন নির্দিষ্ট অঞ্চলে দৃষ্টি গোচর হবে? না কি বিভিন্ন মাসের চাঁদ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে দেখো যাবে?

যেহেতু প্রমাণিত যে, নুতন চাঁদ সকল সময়ই মধ্য প্রাচ্যের যে কোন দেশে সর্ব প্রথম দৃষ্টি গোচর হবে। তাই মধ্যপ্রাচ্যের স্থানীয় সময়ের সবচেয়ে বেশী অগ্রগামী সময়ের দেশ জাপানবাসীর জন্য ১ম তারিখের রোযা রাখার সম্ভাব্যতা সর্বাধিক প্রশ্ন সাপেক্ষ। কিন্তু গবেষণায় সুপ্রমাণিত যে, ঐ দিন জাপানবাসীর জন্যও রোযা রাখা সম্ভব। যেমন বছরের সবচেয়ে ছোট রাত জুলাই মাসকেও যদি আলোচনায় আনা হয় তবে দেখা যাবে, জুলাই মাসে সর্ব শেষ সূর্যাস্ত হয় ৬টা ৫৫ মিনিটে। তাহলে মধ্য প্রাচ্যে সূর্যাস্তের পর পর সন্ধ্যা ৭টায় নুতন চাঁদ দেখা গেল। ঐ সময় পৃথিবীর সর্বপূর্ব স্থান জাপানে রাত ১টা ২৮ মিনিট। কারণ মধ্যপ্রাচ্য ও জাপানের মধ্যে অবস্থানগত দূরত্ব ৯৭ ডিগ্রী পূর্ব দ্রাঘিমাংশ। ফলে স্থানীয় সময় মধ্য প্রাচ্যের স্থানীয় সময়ের চেয়ে ৬ঘন্টা ২৮মিনিট অগ্রগামী। তাহলে ফলাফল দাড়াল মধ্য প্রাচ্যে সন্ধ্যা ৭টায় চাঁদ দেখা গেলে জাপানে সে চাঁদ দেখার সংবাদ পৌঁছতেছে রাত ১টা ২৮ মিনিটে। অথচ জুলাই মাসে সাহরী খাওয়ার সর্বনিম্ন সময় হলো ৩টা ৪৩ মিনিট। তাহলে জাপানবাসী চাঁদ উদয়ে সংবাদ পাওয়ার পরেও রোযা রাখতে সাহরী খাওয়ার জন্য সময় পাচ্ছেন প্রায় ২ ঘন্টা ১৫ মিনিট। যা সাহরীর জন্য কোন বিবেচনায়-ই অপ্রতুল নয়। উপরন্ত ঐ সময়ের মধ্যে তারাবীর নামায আদায় করাও সম্ভব। আর পশ্চিমাঞ্চলীয় দেশের জন্য আমল করা কোন ভাবেই কষ্টকর নয়। কারণ যত পশ্চিমাঞ্চলীয় দেশের দিকে আসা হবে তারা চাঁদ উদয়ের সংবাদের পরে সাহরী খাওয়ার জন্য ততবেশী সময় পাবে।  

দুই:  যদি প্রশ্ন করা হয়, আমরা বাংলাদেশে যখন ইফতার করি তখন আমেরিকায় ভোর, আবার আমরা যখন সাহরী খাই তখন আমেরিকায় বিকাল, তাহলে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যে একই দিনে আমল করা কি করে সম্ভব?

জবাব: অত্র পশ্নের উত্তর বুঝার জন্য দু’টি মৌলিক বিষয় গভীর ভাবে স্মরণ রাখতে হবে।
 এক; চাঁদের তারিখ সংশ্লিষ্ট আমলগুলো সমগ্র পৃথিবীতে একই সময়ে অনুষ্ঠিত হবেনা। বরং একই দিনে (অর্থাৎ শুক্র, শনি, রবি----------বুধ বা বৃহস্পতিবারে) এবং একই তারিখে অনুষ্ঠিত হবে।
 দুই; যেহেতু সব সময়েই মধ্যপ্রাচ্যের কোন না কোন দেশে সর্বপ্রথম নুতন চাঁদ দেখা যাবে তাই চাঁদের তারিখ নির্ভর সকল ইবাদাত পালনের ক্ষেত্রে পৃথিবীর যে কোন দেশের সময়ের হিসেব মধ্যপ্রাচ্যের স্থানীয় সময়ের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। বাংলাদেশ বা অন্য কোন দেশের সময়ের সঙ্গে নয়।

তাহলে মনে করা যাক, বৃহস্পতিবার দিবাগত সন্ধ্যা ৭টায় মধ্য প্রাচ্যে পবিত্র রমযানের চাঁদ দেখা গেল এবং প্রমাণিত হল শুক্রবার ১ রমযান। এখন সমগ্র বিশ্বে ১ রমযান হিসেবে শুক্রবারে রোযা রাখা যায় কিনা এটাই মূল বিবেচনার বিষয়।

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৭টায় যখন মধ্য প্রাচ্যে চাঁদ দেখা গেল তখন ঐ চাঁদ দেখার সংবাদ ১৪২ডিগ্রী পূর্ব দ্রাঘিমাংশে অবস্থিত সর্বপ্রথম সূর্যোদয়ের দেশ জাপানে পৌঁছবে জাপানের স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১টা ২৮মিনিটে। অথচ সাহরীর সর্বশেষ সময় সীমা কখনই ৩টা ৪৩মিনিটের নিম্নে আসেনা। তাহলে জাপানবাসী বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে চাঁদ উদয়ের সংবাদ শুনে শুক্রবারে রোযা রাখার জন্য সাহরী খেতে সময় পাচ্ছেন (৩:৪৩মিঃ - ১:২৮মিঃ) ২ঘন্টা ১৫মিনিট।

এমনিভাবে ১২০ডিগ্রী পূর্ব দ্রাঘিমাংশে অবস্থিত দেশ ইন্দোনেশিয়ার সুমবা, ফ্লোরেস, ফিলিপাইন, তাইওয়ান, চীনের শেংইয়াং, হাইলার, ইনহো, রাশিয়ার টালুমা, খরিনটস্কি, সুখানা এবং অলিনেক অঞ্চলে চাঁদ দেখার সংবাদ পৌঁছবে বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১২টায়। ফলে বছরের সব চেয়ে ছোট রাতেও চাঁদ উদয়ের সংবাদ পাবার পরে শুক্রবার ১ রমযানের রোযা রাখতে সাহরী খাওয়ার জন্যে তারা সময় পাবে ৩ ঘন্টা ৪৩ মিনিট। অতএব তাদের জন্যে শুক্রবার রোযা রাখা সম্ভব। এরপরে ১০৫ডিগ্রী পূর্ব দ্রাঘিমাংশে অবস্থিত দেশ তেলাকবেটং, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, লাওস, চীনের ইপিং, চেংটু, মোঙ্গলিয়া এবং রাশিয়ার মধ্য সাইবেরিয়ান অঞ্চলে চাঁদ দেখার সংবাদ পৌঁছবে বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১১টায়। ফলে তারাবীহ ও সাহরীর জন্যে তারা সময় পাবে ৪ ঘন্টা ৪৩ মিনিট। তারপরে ৯০ডিগ্রী পূর্ব দ্রাঘিমাংশে অবস্থিত দেশ বাংলাদেশ, ভুটান, চীনের লাসা, টুরপান, ফাইয়ুন, রাশিয়ার আবাজা অচিনিস্ক, নগিনস্কি অঞ্চলে চাঁদ দেখার সংবাদ পৌঁছবে বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১০টায়। ফলে তারাবীহ ও সাহরীর জন্যে তারা সময় পাবে ৫ ঘন্টা ৪৩ মিনিট এভাবে ৭৫ডিগ্রী পূর্ব দ্রাঘিমায় অবস্থিত দেশ ভারতের দিল্লী, কাশ্মীর, কিরগিজিয়া, পূর্বপাকিস্তানে চাঁদ দেখার সংবাদ পৌঁছবে ঐরাত ৯টায় এবং ৬০ডিগ্রী পূর্ব দ্রাঘিমায় অবস্থিত দেশ পাকিস্তানের করাচী, আফগানিস্তান, পূর্ব ইরান, তুর্কমেনিস্তান, উজবেকিস্তানে চাঁদ দেখার সংবাদ পৌঁছবে ওখানকার স্থানীয় সময় রাত ৮টায়। তাহলে প্রমাণিত হল মধ্যপ্রাচ্য থেকে শুরু করে জাপান পর্যন্ত পূর্ব গোলার্ধের সকল দেশে শুক্রবার ১ রমযানের রোযা রাখা সম্পূর্ণ সম্ভব।

এবার পশ্চিমাঞ্চলীয় দেশ নিয়ে আলোচনা করা যাক। ৪৫ডিগ্রী পূর্ব দ্রাঘিমাংশে অবস্থিত মধ্যপ্রাচ্যে যখন বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৭টায় রমযানের চাঁদ দেখা গেল তখন ৩০ডিগ্রী পূর্ব দ্রাঘিমাংশে অবস্থিত দেশ দক্ষিন আফ্রিকার ডারবান, জিম্বাবুই, জাম্বিয়ার বেলা, তানজানিয়ার বরুনডি, সুদান, মিসর, তুরস্কের বুরসা, ইউক্রেন এবং রাশিয়ার লেলিন গ্রাদ ইত্যাদি অঞ্চলে উক্ত চাঁদ দেখার সংবাদ পৌঁছবে ঐ অঞ্চল সমূহের স্থানীয় সময় বিকাল ৬টায়। ফলে চাঁদ উদয়ের সংবাদ পাবার পরে শুক্রবার ১ রমযানের রোযা রাখতে তারা সময় পাবেন ৯ ঘন্টা ৪৩ মিনিট। এমনি ভাবে ১৫ডিগ্রী পূর্ব দ্রাঘিমাংশে অবস্থিত দেশ সমূহে চাঁদ দেখার সংবাদ পৌঁছবে বৃহস্পতিবার বিকাল ৫টায়। ০ডিগ্রী পূর্ব দ্রাঘিমাংশে অবস্থিত দেশ টগো, মালি, আলজেরিয়ার রেগান, ওরান, স্পেনের ভ্যালেনসিয়া, ফ্রান্সের বদৌস ও প্যারিস এবং লন্ডন অঞ্চল সমূহে চাঁদ দেখার সংবাদ পৌঁছবে বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টায়। আরো পশ্চিমে ১৫ডিগ্রী পশ্চিম দ্রাঘিমাংশে অবস্থিত দেশ সেনেগাল, মৌরতানিয়ার নৌয়াকচট, পশ্চিম সাহারা, পূর্ব আইসল্যান্ড ইত্যাদি অঞ্চলে চাঁদ দেখার সংবাদ পৌঁছবে বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টায়। এমনি করে ৩০ডিগ্রী পশ্চিম দ্রাঘিমায় দুপুর ২টায়, ৪৫ডিগ্রী পশ্চিম দ্রাঘিমায় দুপুর ১টায়, ৬০ডিগ্রী পশ্চিম দ্রাঘিমাংশে পূর্ব আর্জেটিনায়, প্যারাগুয়ে, মধ্য ব্রাজিলে, পূর্ব ভেনিজুয়েলায়, পূর্ব কানাডায় এবং পশ্চিম গ্রীনল্যান্ডে চাঁদ দেখার সংবাদ পৌঁছবে বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টায়। এমনি করে ৭৫ডিগ্রী পশ্চিম দ্রাঘিমায় সংবাদ পৌঁছবে বেলা ১১টায়। ৯০ডিগ্রী পশ্চিম দ্রাঘিমায় সংবাদ পৌঁছবে বেলা ১০টায়। ১০৫ডিগ্রী পশ্চিম দ্রাঘিমার দেশ সমূহ মেক্সিকো, যুক্তরাষ্ট্রের আলবুক্‌য়ার্ক, ডেনভার, সিয়েন, মাইলস্‌ সিটি এবং মধ্য কানাডীয় অঞ্চলে চাঁদ দেখার সংবাদ পৌঁছবে এসব অঞ্চলের স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার সকাল ৯টায়। এমনি ভাবে সর্বশেষ ১৮০ডিগ্রী পশ্চিম দ্রাঘিমার দেশ যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জ, আলিউটিয়ান দ্বীপপুঞ্জে চাঁদ দেখার সংবাদ পৌঁছবে সেখানের স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার ভোর ৪টায়। এবং উল্লেখিত সকল দ্রাঘিমায় অবস্থিত দেশ সমূহের অধিবাসীরা জানবে যে, মধ্য প্রাচ্যে বৃহস্পতিবার দিবাগত সন্ধ্যা ৭টায় নুতন চাঁদ দেখার কারণে ১ রমযান হচ্ছে শুক্রবার। অতএব মধ্যপ্রাচ্য থেকে পশ্চিম দ্রাঘিমার দেশগুলো যথাক্রমে বৃহস্পতিবার দিনের অংশ ও পূর্ণদিন অতিক্রমের পরে স্থানীয় ভাবে যে দেশে যখন শুক্রবার শুরু হবে সে দেশে তখন শুক্রবারে ১ রমজানের রোযা পালন করবে। উল্লেখিত আলোচনার সারকথা হলো শুক্রবার দিবসটি জাপানে শুরু হবে মধ্যে প্রাচ্যের ৬ঘন্টা ২৮মিনিট পূর্বে এবং পশ্চিম যুক্তরাষ্ট্রে শুরু হবে মধ্য প্রাচ্যের স্থানীয় সময়ের ১৫ঘন্টা পরে। কিন্তু দিন একটিই তাহল শুক্রবার। তবে উভয় স্থানে দিন ও তারিখ হবে অভিন্ন। অতএব জাপানে শুক্রবারের রোযা শুরু হবে পশ্চিম যুক্তরাষ্ট্রের ২৩ঘন্টা পূর্বে। আবার পশ্চিম যুক্তরাষ্ট্রে রোযা শুরু হবে জাপানের স্থানীয় সময়ের ২৩ঘন্টা পরে। যেমন আমাদের বাংলাদেশে আমরা রোযা রাখলাম শুক্রবার। কিন্তু পাবর্ত্য চট্টগ্রামে সাহরীর শেষ সময় যদি হয় ৪টা ৩০মিনিট, তবে রাজশাহীতে সাহরীর শেষ সময় হবে আরো ১৩ মিনিট পরে অর্থাৎ ৪টা ৫৩ মিনিট। তাহলে বাংলাদেশে শুক্রবারের রোযা পার্বত্য চট্টগ্রামে শুরু হল ১৩ মিনিট পূর্বে এবং রাজশাহীতে শুরু হল ১৩ মিনিট পরে। ঠিক তেমনি সমগ্র পৃথিবীতে রোযা শুরু ও শেষ হওয়ার সময় স্থানীয় সময় অনুপাতে আগ-পিছ হলেও দিন ও তারিখ হবে অভিন্ন। অতএব সমগ্র পৃথিবীতে অভিন্ন দিন ও তারিখে রোযা রাখা এবং ঈদ করা সম্পূর্ণ সম্ভব।  

তিন:  যদি প্রশ্ন করা হয়, যে সকল ইমাম, ফকীহ নিজ নিজ কিতাবে উক্ত মাসয়ালা লিখেছেন আবার তারাই নিজেদের ফাতওয়ার বিপরীতে এলাকা ভিত্তিক আমল করেছেন। এর কারণ কি?

জবাব: ইমাম ও ফকীহগণ তাদের ফাতওয়ার বিপরীত আমল করেছেন একথা ঠিক নয়। তারা সর্বপ্রথম চাঁদ দেখার সংবাদ গ্রহণযোগ্য সূত্রে যতটুকু এলাকায় পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে ততটুকু এলাকায় আমল করেছেন। এ ছাড়াও সত্য সন্ধানী চিন্তাশীল ব্যক্তিদের জন্য এ প্রশ্নের জবাব খুবই সহজ। তা হল উপরোল্লেখিত ইমাম ও ফকীহগণের সকলের জীবদ্দশায়ই আধুনিক উন্নত ইলেকট্রনিক সংবাদ মিডিয়া ছিলনা। যার ফলে তারা তাৎক্ষনিকভাবে চাঁদ দেখার সংবাদ এক দেশ থেকে অন্য দেশে দিতে বা নিতে পারেন নি। এ ওজর বা বাধ্যবাধকতার কারণেই তারা বাহ্যিক চোখে যেদিন যে অঞ্চলে চাঁদ দেখেছেন এবং যতদূর পর্যন্ত সংবাদ দিতে-নিতে পেরেছেন ততদূর পর্যন্ত অঞ্চলে আমল করেছেন। অবশ্যই এটা তাদের ভুল ছিলনা বরং সময়ের দাবীতে এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার অসুবিধার কারণে তাদের এ আমল সম্পূর্ণ যুক্তি সঙ্গত ছিল। ওজর সম্বলিত তাদের সে আমলই কালের পরিক্রমায় সমাজের প্রতিটি স্নায়ূতে মিশে গেছে। কিন্তু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অবদানে বর্তমানে ইমাম ও ফকীহগণের প্রদত্ত্ব মূল ফাতওয়ার বিপরীত আমল করার কোন সুযোগ নেই।

চার:  যদি প্রশ্ন করা হয়, কোন মুফতি যখন নিজ ফাতওয়ার বিপরীতে আমল করেন তখন তার ফাতওয়া অকার্যকর হয়ে যায় কি না?

জবাব: যদি কোন মুফতি তার প্রদত্ব ফাতওয়ার বিপরীত আমল করেন তবে কখনই তার ফাতওয়া অকার্যকর হয়না। কারণ অছুলে হাদীস (হাদীস ব্যাখ্যা করার মূলনীতি) এবং অছুলে ফিকহ (মাসয়ালা রচনার মূলনীতি) এর বিধান হল, যদি একই বিষয়ে একই বর্ণনাকারীর বর্ণনা এক রকম আর আমল অন্য রকম হয় তখন দলিলের ক্ষেত্রে আমলের উপরে বর্ণনা প্রাধান্য পাবে। কারণ বর্ণনার ক্ষেত্রে কোন ওজর নেই কিন্তু আমলের ক্ষেত্রে কোন না কোন ওজর থাকা স্বাভাবিক।

আর এ বিষয়ে কোন মুফতি নিজ ফাতওয়ার বিপরীত আমল করেননি। বরং তারা এ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি তাদের সাধ্য অনুযায়ী বাস্তবায়নের আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন।

পাঁচ:  যদি প্রশ্ন করা হয়, ফাতওয়ায় উপস্থাপিত দলীল সমূহের মূল ফিকহ গ্রস্থগুলো আমাদের সম্মানিত আলেমগণ পড়েন না?

জবাব: জবাবে বলব, এ প্রশ্ন আমাদেরকে না করে তাদেরকে করাই যথার্থ হবে। কারণ তারা ঐ সকল মূল কিতাবগুলো পড়েন কি পড়েন না অথবা বুঝেন কি বুঝেন না এটা তারা ভাল বলতে পারবেন। তদোপরি বিষয়টি তাদের একান্তই নিজস্ব ব্যাপার। যে কিতাবগুলোর দলীল আমরা উপস্থাপন করেছি সে গুলো পড়ে একজন মুকাল্লিদ আলেম তার মাযহাবের ইমাম ও পরবর্তী বিশ্ববিখ্যাত ফকীহগণের ফাতওয়া ভুল ছিল এ কথা বলার ধৃষ্টতা দেখাবেন তা আমরা মনে করিনা। একটি আমল যুগযুগ ধরে চলে আসছে তাই তারা বিষয়টি গুরুত্ব দিচ্ছেন না। অথবা গুটি কয়েক মুরুব্বীর অনুকরণ করে কিতাবের ফাতওয়াকে উপেক্ষা করছেন। তবে ইসলাম যে বাস্তব ও বিজ্ঞান ভিত্তিক জীবন ব্যবস্থা এবং যাবতীয় যুগ জিজ্ঞাসার সমাধান দিতে সক্ষম তা উপলব্ধি করে সম্মানিত ওলামায়ই কিরাম বিষয়টি বিবেচনা করলেই সমস্যার সহজ সমাধান হবে। বর্তমানে কোন ভাবেই মূল ফাতওয়ার বিপরীত আমল করার সুযোগ নেই।  

ছয়:  যদি প্রশ্ন করা হয়, রেডিও, টিভি, মাইক, টেলিফোন, মোবাইল ইত্যাদির আওয়াজ কি কথকের আওয়াজ, না কি কথকের আওয়াজের প্রতিধ্বনি সে বিষয়ে বিজ্ঞানীগণ আজও এক মত হতে পারেননি। তাই উক্ত মাধ্যম গুলোর সংবাদ শরীয়ত সম্মত হবে কি করে?

জবাব: এর জবাবে এতটুকু বলাই যথেষ্ট বলে আমরা মনে করি যে, যে সকল সম্মানিত আলেমগণ বিজ্ঞানীদের মতানৈক্যের অসার যুক্তি দেখিয়ে আধুনিক যান্ত্রিক মিডিয়ার সংবাদকে শরীয়ত সম্মত নয় বলে সস্তা ফাতওয়া জারী করেন। তারা রীতিমত নিজেদেরকেই মিথ্যাবাদী প্রমাণ করছেন। কারণ তাদের নিষিদ্ধ ঘোষিত ঐ সকল যান্ত্রিক মিডিয়া তারা অহরহ ব্যবহার করেন। উহার মাধ্যমে আযান একামত, ওয়াজ নসিহত ও নামাজ আদায় করেন। মোবাইল ও টেলিফোনের অপর প্রান্তের সকল কথা পুরোপুরি বিশ্বাস নিয়ে তারা জবাব দেন। অথচ তাদের আপত্তি কেবল চাঁদের সংবাদের ক্ষেত্রে। আরো মজার ব্যাপার হল বাংলাদেশে চাঁদ দেখার সংবাদ প্রশ্ন কর্তারা এ সকল মিডিয়াতেই প্রচার করে থাকেন।  

সাত:  যদি প্রশ্ন করা হয়, মধ্যপ্রাচ্যে চাঁদ দেখার তারিখ অনুযায়ী বাংলাদেশে রোযা ও ঈদ হবে, তাহলে আমরা কেন আরবদেশ গুলোর সঙ্গে একই সময়ে সাহরী ও ইফতারী খাইনা এবং নামায আদায় করি না?

জবাব: এখানে একটি মৌলিক কথা মনে রাখতে হবে যে, রোযা ফরয হওয়া নামায ফরয হওয়া এক বিষয়। আর রোযা আদায় করা নামায আদায় করা এবং সাহরী ও ইফতারী খাওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।

রোযা ফরয হওয়া, নামায ফরয হওয়াকে বলে আসবাবে ওযুব বা ওয়াজিব হওয়ার কারণ। পক্ষান্তরে নামায আদায় করা, রোযা সমাপন করাকে বলে আসবাবে আদা বা সমাপনের কারণ।

অর্থাৎ প্রতিটি আমলেরই দু’টি দিক রয়েছে। একঃ আমলটি ফরয হওয়া, দুইঃ ফরয হওয়া উক্ত আমলকে কার্যের মাধ্যমে বাস্তবায়িত করা। রোযার ক্ষেত্রেও অনুরূপ। প্রথমত; রোযা ফরয হওয়া, দ্বিতীয়ত; রোযাকে কাজের মাধ্যমে পূর্ণতা দেয়া।

এ প্রথমটি অর্থাৎ রোযা ফরয হওয়া নির্ভর করে চাঁদ দেখার মাধ্যমে মাসের উপস্থিতির উপর। ফলে পৃথিবীর আকাশে পবিত্র রমযান মাসের চাঁদ দেখার মাধ্যমে রমযান মাস প্রমাণিত হওয়ার সাথে সাথে সমগ্র পৃথিবীর সকল মু’মিন নারী পুরুষের উপর একই সাথে রোযার ফরয হওয়া সাব্যস্ত হয়ে যায়। এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনের ঘোষণা হলো-  فمن -شهد منكم الشهر فليصمه

অর্থাৎ তোমদের মধ্যে যে ব্যক্তিই রমযান মাসে উপনিত হবে সেই যেন রোযা রাখে।
----(সূরা বাকারা-১৮৫)

এখন প্রশ্ন হলো এ ফরয হওয়া রোযা আমরা কিভাবে আদায় করব। যা রোযার দ্বিতীয় দিক অর্থাৎ রোযাকে কার্যে পরিণত করা যা শুরু হয় সাহরী খাওয়ার মাধ্যমে এবং শেষ হয় ইফতারীর মাধ্যমে।

আর এ দ্বিতীয়টি অর্থাৎ সাহারী ও ইফতারীর মাধ্যমে রোযাকে কার্যে পরিণত করা নির্ভর করে সূর্যের পরিভ্রমণের উপর। যে সম্পর্কে পবিত্র কুরআনের ঘোষণা হলো-


-كولوا واشربوا حتى يتبين لكم الخيط الابيض من الخيط الاسود من الفجر ثم اتموا الصيام الى الليل
অর্থাৎ তোমরা পানাহার করো যতক্ষণ না কাল রেখা থেকে (পূর্ব আকাশে) ভোরের শুভ্র রেখা পরিষ্কার হয়। অতপর রোযা পূর্ণ কর রাত পর্যন্ত।
---- (সূরা আল-বাকারা-১৮৭)

অত্র আয়াতের ঘোষণা থেকে পরিষ্কার বুঝা যাচ্ছে, রোযা কার্যের মাধ্যমে বাস্তবায়িত করার শুরু হচ্ছে সুবহি সাদিক এবং রোযা সমাপ্ত হবে রাতের শুরুতে যা ইফতারীর সময়। সুবহি সাদিক এবং রাত হওয়া অবশ্যই সূর্যের পরিভ্রমণের সাথে সম্পর্কিত, চাঁদের সাথে নয়।

তাহলে উপরোক্ত দু’টি আয়াতের সার কথা এই দাঁড়ালো যে পৃথিবীর কোথাও চাঁদ উদয় প্রমাণিত হওয়ার সংবাদ গ্রহনযোগ্য মাধ্যমে পাওয়ার সাথে সাথে সকল পৃথিবীবাসীর উপর রোযা ফরয হবে। রোযা বাস্তবায়িত করতে হবে সূর্যের পরিভ্রমণের দ্বারা। তাই সূর্যের পরিভ্রমণের প্রতি লক্ষ্য রেখেই স্থানীয় সময়ানুপাতে পৃথিবীর ভিন্ন ভিন্ন স্থানে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে সাহরী, ইফতার ও নামায আদায় করতে হয়। যেহেতু বাংলাদেশে সূয উদয়-অস্ত মধ্য প্রাচ্যের উদয়-অস্ত সময় থেকে ৩ঘন্টা অগ্রগামী সে কারণেই বাংলাদেশে সাহরী, ইফতার ও নামাযের সময় মধ্য প্রাচ্যের স্থানীয় সময়ের চেয়ে ৩ঘন্টা আগে হবে। সুতরাং এব্যাপারে আর কোন প্রশ্ন থাকতে পারে না। মনে করুন রাষ্ট্রীয় ঘোষণা মতে সমগ্র বাংলাদেশ বাসী শুক্রবার ১ রমজানের রোযা রাখলেন। অথচ ঐ দিনই পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের সাহরীর শেষ সময় ও ইফতারীর সময় যখন হয়, তার ১৩মিনিট পরে হবে পঞ্চগড়ের অধিবাসীদের সাহরী ও ইফতারীর সময়। এর কারণ হল রোযা ফরয হয় চাঁদের তারিখের ভিত্তিতে। তাই একই তারিখে সকলে রোযা রাখবে। আর সাহারী, ইফতার ও নামাজের সময় হয় সূর্যের গতি বিধিতে। ফলে যার যার স্থানীয় সময়ানুযায়ী সাহরী ও ইফতার খাবে এবং নামায আদায় করবে।
http://www.newmoonbd.com/faq.php
কুরআন, সুন্নাহ এবং ফিকহের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী একই দিনে সমগ্র বিশ্বে রোযা, ঈদ, কুরবানী ইত্যাদি ইবাদাত পালন করা কীভাবে সম্ভব?
কুরআন, সুন্নাহ এবং ফিকহের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী একই দিনে সমগ্র বিশ্বে রোযা, ঈদ, কুরবানী ইত্যাদি ইবাদাত পালন করা কীভাবে সম্ভব?

 চিন্তাশীলদের কাছে কিছু প্রশ্ন
১. কেন মুসলিম বিশ্বে একই সাথে শবে কদর পালিত হয়না? শবে কদরের রাত কি একটা নাকি দুইটা? ৩০ পারা কুরআন একত্রে যে রাতে নাযিল হয়েছিল সেটাই কদরের রাত। ৩০ পারা কুরআন কি মধ্যপ্রাচ্যে এক রাতে আর বাংলাদেশে তার পরের রাতে অর্থাৎ দুই রাতে নাযিল হয়েছে?
২. রাসূল (স) এর হাদিস দ্বারা প্রমানিত, কিয়ামত ১০ ই মুহাররম শুক্রবারে হবে। আমাদের প্রচলিত গণনা অনুযায়ী মধ্যপ্রাচ্যে যদি শুক্রবারে ১০ ই মুহাররম হয় তবে বাংলাদেশে সেদিন ৯ ই মুহাররম শুক্রবার। আবার যদি বাংলাদেশে শুক্রবারে ১০ ই মুহাররম হয় তবে মধ্যপ্রাচ্যে সেদিন ১১ ই মুহাররম শুক্রবার। কিয়ামত মধ্যপ্রাচ্যের ১০ ই মুহাররম শুক্রবারে হলে বাংলাদেশে সেদিন ৯ ই মুহাররম থাকার কারনে কিয়ামত হবেনা। আর বাংলাদেশের ১০ ই মুহাররম শুক্রবারে কিয়ামত হলে মধ্যপ্রাচ্যে ১১ ই মুহাররম থাকার কারনে কিয়ামত হবেনা।তাহলে কিয়ামত কোন দেশের ১০ ই মুহাররম শুক্রবার অনুযায়ী হবে?
৩. বাংলাদেশ থেকে কেউ রোযা শুরু করে রমযান মাসের যে কোন দিন মধ্যপ্রাচ্যে গিয়ে সেখানে ঈদ করলে তার রোযা ২৮ বা ২৯ টি হয়। আবার মধ্যপ্রাচ্য থেকে কেউ রোযা শুরু করে রমযান মাসের যে কোন দিন বাংলাদেশে এসে এখানে ঈদ করলে তার রোযা ৩০ বা ৩১ টি হয়। ২৮ ও ৩১ রোযার বিধান কি ইসলামে আছে?
৪. অনেকেই বলেন নামাজের ওয়াক্ত মধ্যপ্রাচ্যে ও বাংলাদেশে এক নয় তাহলে শবে কদর এক হবে কিভাবে। তাদেরকে বলি, নামাজের ওয়াক্ত এবং সেহরি ইফতার হয় সূর্য অনুযায়ী কিন্তু যে কোন আরবী মাস শুরু হয় চাঁদ অনুযায়ী। সূর্য ও চাঁদের হিসাব আলাদা। নামাজের ওয়াক্ত এবং সেহরি ইফতার কি চাঁদ অনুযায়ী হয়? আরবী মাস কি সূর্য অনুযায়ী হয়?


 দেশ অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন ভাবে মাস শুরু করায় নানা সমস্যা…...

এধরনের ভিন্ন ভিন্ন মানদ্বন্দের ভিত্তিতে মাস শুরুর করায় মুসলিম বিশ্বে বিচ্ছিন্নতা এবং ধর্মীয় উৎসবগুলো সার্বজনীনতা ও ধর্মীয় তাৎপর্য হারাচ্ছে ।

* রাসুল (সাঃ) এর মক্কা থেকে মদিনায় হিযরতের দিন ১ হিজরী সাল ধরে ১ তারিখ নির্ধারণ করে ১২ মাসে বছর এভাবে হিজরী সাল গণনা হয় ।

বিভিন্ন মানদ্বন্দে চাঁদ দেখা বা স্বাক্ষীর জন্য হিজরী সাল তারিখের গড়মিল হয়েছে ।

*কুরআন নাযিল হয়েছে লাইতুল ক্বদরে(বাকারা-১৮৫; ক্বদর-১) ।

হযরত আয়েশা (রাজিঃ) বলেন, রাসুল (সাঃ) বলেছেন,
রমযানের শেষ দশ তারিখের বেজড় রাতসমুহে লাইলাতুল কদরকে তালাশ কর-সহিহ আল বুখারী ২/২৮৪ হাদিস নং ১৮৭৪

কোন দেশের ক্বদরের তারিখে কুরআন নাযিল হয়েছে !!

এক দেশে জোড় অন্য দেশে বিজোড় !!! কাদের তারিখ অনুযায়ী লাইতুল ক্বদর হঠিক হবে !!!

*ঈদের দিন রোজা রাখা হারাম-
হযরত আবু উবাইদা (রাজিঃ) বলেন, আমি হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রাজিঃ) এর সাথে ঈদের নামাজ আদায় করেছি । তিনি বলছেন, এ দুই দিনের রোযা রাখা থেকে নবী (সাঃ) নিষেধ করেছেন ।

প্রথম দিন হলো, যখন তোমরা রোযা শেষ কর, আর দ্বিতীয় দিন হলো, যখন তোমরা কোরবানীর গোস্ত খাবে-সহিহ আল বুখারী ২/২৭২ হাদিস নং ১৮৫১

*আবু সাঈদ খুদরী রা: থেকে বর্নীত, রাসুল (সাঃ) রোযার ঈদের দিন এবং কুরবানীর ঈদের দিন রোযা রাখতে নিষেধ করেছেন (সূত্র: সহীহ সহীহ বুখারী ৩য় খন্ড/১৮৬৭, ১৮৬৮ ও সহীহ মুসলিম ৩য় খন্ড/২৫৩৭-২৫৪২)

এক দেশে ঈদ অন্য দেশে রোজা রাখে !! কে হারাম কাজ করে ?!!

* আরাফা (জিলহজ্ব মাসের নয় তারিখ) ও আশুরার (দশই মুহাররাম) তারিখের ফযিলত- হযরত আবু কাতাদাহ (রাজিঃ) বলেন, রাসুল (সাঃ) বলেছেন,
আরাফার রোযা আগের পরের দু’বৎসরের গুনাহ মাফ করে দেয় এবং আশুরার রোযা বিগত এক বৎসরের গুনাহ সমুহ ক্ষমা করে দেয়-আহমাদ, আবুদাউদ, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ, মুসলিম শরীফ ৪/১২৬ হাদিস নং ২৬১৪

আরাফা ও আশুরার তারিখ কোন দেশেরটা সঠিক !!

* জিলহজ্বের ১০ তারিখে (সউদীর চাঁদের উপর নির্ভর করে) হাজিগণ কুরবানী করেন ।

* হাদীস অনুযায়ী কিয়ামত হবে ১০ই মুহাররমের শুক্রবার ।

কিয়ামত পৃথিবীতে কয়দিন হবে !!

উপরের বিষয়গুলোর তারিখ যা চাঁদের উদয়ের উপর নির্ভর করে নির্ধারণ করা হয় । যার যার নিজ দেশের চাঁদ উদয়ের উপর নির্ভর করে উক্ত তারিখ গণনা করলে সমগ্র বিশ্বে ভিন্ন ভিন্ন দিন হয় । আবার কোন দেশে ২৯ বা ৩০ দিনে মাস শেষ অন্য দেশে আর ১ দিন বা ২ দিন পরে মাস শেষ হয় । অর্থাৎ

উক্ত দুই দেশে একত্র করলে মাসের দিন হয় ৩০ বা ৩১/৩২ যা শরীয়ায় কোন দলিল পাওয়া যায় না ।

সর্বজন স্বীকৃত যে উক্ত দিন (তারিখ) পৃথিবীতে একটাই হবে এবং আরবী মাস ২৯ বা ৩০ দিনে ।

অতএব উক্ত দিনের তারিখ সঠিক না হলে গুনাহ্‌গার বা ফযিলত থেকে বঞ্চিত হতে হবে ।

একথা সকলেরই জানা, শবে ক্বদর, আরাফা, পবিত্র ঈদুল আযহা, আশুরা, ঈদ-ই-মিলাদুন নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম, পবিত্র শব-ই-মিরাজ, শব-ই-বরাত পালনের দিন তারিখ বেশ কিছু দিন পূর্বেই সংবাদ পাওয়া যায় । যা বিশ্বে একই দিনে পালন করা সম্ভব।

রমযান মাসের ১ম (যে কোন মাসের ১ম) তারিখ নির্ধারন এবং বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছানোর উপর নির্ভর করে ১ম রোজা এবং ঈদুল ফিতর (পরবর্তী মাস) ।

প্রত্যেক মাসের ১ম তারিখ নির্ধারনে বিশ্ব মুসলিম উম্মা এক হলেই সকল ইবাদত একই দিনে পালন করা সম্ভব হবে ।
বিস্তারিত দেখুন- http://sottersondhane.blogspot.com/2013/05/blog-post.html (pls click & read)

"পৃথিবীর পশ্চিম প্রান্তের অধিবাসীদের কেউ রমজানের চাঁদ দেখলে পৃথিবীর পূর্ব প্রান্তের অধিবাসীদের ওপরও ওই রোজা ফরজ হবে।"

 পৃথিবী একটা, চাঁদ একটা, কোরআন একটা, সমস্ত মুসলিম একজাতি, সবাই এক নবীর উম্মাত, তাহলে ঈদ কেন তিন দিনে করব ?..!


ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ তার মাজমু' আল ফাতওয়া গ্রন্থে বলেন,
مُخَالِفٌ لِلْعَقْلِ وَالشَّرْعِ
"এ বিষয়টি (চাঁদ দেখাকে কোনো একটা নির্দিষ্ট দূরত্ব বা দেশের মধ্যে সীমিত করাটা) যুক্তি এবং শরীয়ত উভয়েরই পরিপন্থি।"
'ফতওয়া-ই আলমগিরি'-তে বলা হয়েছে,
لَوْ رَأَى أَهْلُ مَغْرِبٍ هِلَالَ رَمَضَانَ يَجِبُ الصَّوْمُ عَلَى أَهْلِ مَشْرِقٍ
"পৃথিবীর পশ্চিম প্রান্তের অধিবাসীদের কেউ রমজানের চাঁদ দেখলে পৃথিবীর পূর্ব প্রান্তের অধিবাসীদের ওপরও ওই রোজা ফরজ হবে।"

 ১. কেন মুসলিম বিশ্বে একই সাথে শবে কদর পালিত হয়না? শবে কদরের রাত কি একটা নাকি দুইটা? ৩০ পারা কুরআন একত্রে যে রাতে নাযিল হয়েছিল সেটাই কদরের রাত। ৩০ পারা কুরআন কি মধ্যপ্রাচ্যে এক রাতে আর বাংলাদেশে তার পরের রাতে অর্থাৎ দুই রাতে নাযিল হয়েছে? ২. রাসূল (স) এর হাদিস দ্বারা প্রমানিত, কিয়ামত ১০ ই মুহাররম শুক্রবারে হবে। আমাদের প্রচলিত গণনা অনুযায়ী মধ্যপ্রাচ্যে যদি শুক্রবারে ১০ ই মুহাররম হয় তবে বাংলাদেশে সেদিন ৯ ই মুহাররম শুক্রবার। আবার যদি বাংলাদেশে শুক্রবারে ১০ ই মুহাররম হয় তবে মধ্যপ্রাচ্যে সেদিন ১১ ই মুহাররম শুক্রবার। কিয়ামত মধ্যপ্রাচ্যের ১০ ই মুহাররম শুক্রবারে হলে বাংলাদেশে সেদিন ৯ ই মুহাররম থাকার কারনে কিয়ামত হবেনা। আর বাংলাদেশের ১০ ই মুহাররম শুক্রবারে কিয়ামত হলে মধ্যপ্রাচ্যে ১১ ই মুহাররম থাকার কারনে কিয়ামত হবেনা।তাহলে কিয়ামত কোন দেশের ১০ ই মুহাররম শুক্রবার অনুযায়ী হবে? ৩. বাংলাদেশ থেকে কেউ রোযা শুরু করে রমযান মাসের যে কোন দিন মধ্যপ্রাচ্যে গিয়ে সেখানে ঈদ করলে তার রোযা ২৮ বা ২৯ টি হয়। আবার মধ্যপ্রাচ্য থেকে কেউ রোযা শুরু করে রমযান মাসের যে কোন দিন বাংলাদেশে এসে এখানে ঈদ করলে তার রোযা ৩০ বা ৩১ টি হয়। ২৮ ও ৩১ রোযার বিধান কি ইসলামে আছে? ৪. অনেকেই বলেন নামাজের ওয়াক্ত মধ্যপ্রাচ্যে ও বাংলাদেশে এক নয় তাহলে শবে কদর এক হবে কিভাবে। তাদেরকে বলি, নামাজের ওয়াক্ত এবং সেহরি ইফতার হয় সূর্য অনুযায়ী কিন্তু যে কোন আরবী মাস শুরু হয় চাঁদ অনুযায়ী। সূর্য ও চাঁদের হিসাব আলাদা। নামাজের ওয়াক্ত এবং সেহরি ইফতার কি চাঁদ অনুযায়ী হয়? আরবী মাস কি সূর্য অনুযায়ী হয়?

 চার মাযহাবের সমন্বিত ফিকহ গ্রন্থ আল ফিকহ আলা মাযাহিবিল আরবায়া নামক গ্রন্থের ভাষ্য হচ্ছে- "পৃথিবীর কোন এক প্রান্তে চাঁদ দেখা প্রমাণিত হলে সকল স্থানেই উক্ত দেখার দ্বারা রোযা ফরয হবে । চাই চাঁদ নিকটবর্তী দেশে দেখা যাক বা দূরবর্তী দেশে দেখা যাক এতে কোন পার্থক্য নেই । তবে চাঁদ দেখার সংবাদ গ্রহণযোগ্য পদ্ধতিতে অন্যদের নিকট পৌছতে হবে । তিন ইমাম তথা ইমাম আবু হানীফা রহমাতুল্লাহি আলাইহি,ইমাম মালেক রহমাতুল্লাহি আলাইহি এবং ইমাম আহমদ ইবনু হাম্বল রহমাতুল্লাহি আলাইহি-এর মতে চাঁদের উদয়স্থলের ভিন্নতা গ্রহণীয় নয় । অর্থাৎ প্রথম দিনের দেখার দ্বারাই সর্বত্র আমল ফরয হয়ে যাবে" (আল ফিকহ আলা মাযাহিবিল আরবায়া, খন্ড-১, পৃঃ-৪৪৩) 


উপমহাদেশের অন্যতম ইসলামী শিক্ষা কেন্দ্র “দারুল উলুম দেওবন্দ”-এর গ্রান্ড মুফতি আযিযুর রহমান সাহেব ফতোয়া-ই-দারুল উলুম দেওবন্দ-এ লিখেছেন- অর্থাৎ, হানাফী মাযহাব মতে চাঁদের উদয় স্থলের ভিন্নতা গ্রহনীয় নয় । যদি কোন স্থানে শা’বান মাসের ২৯ তারিখে রমযানের চাঁদ দেখা যায় এবং শরয়ীভাবে তা প্রমাণিত হয় তখন ঐ হিসেবেই সকল স্থানে রোযা রাখা অপরিহার্য হয়ে যাবে । যে স্থানের লোকেরা সংবাদ পরে পাওয়ার কারণে শা’বান মাস ৩০ দিন পূর্ণ করে রোযা শুরু করেছে তারাও প্রথমদের সঙ্গে ঈদ করবে এবং প্রথমের একটি রোযা কাযা করবে-(ফাতওয়া-ই-দারুল উলুম দেওবন্দ, খন্ড-৬, পৃঃ-৩৯৮)



ইমাম শাওকানী (রহ) তাঁর নাইল উল-আওতার কিতাবে লিখেছেন:
وَاعْلَمْ أَنَّ الْحُجَّةَ إنَّمَا هِيَ فِي الْمَرْفُوعِ مِنْ رِوَايَةِ ابْنِ عَبَّاسٍ لَا فِي اجْتِهَادِهِ الَّذِي فَهِمَ عَنْهُ النَّاسُ وَالْمُشَارُ إلَيْهِ بِقَوْلِهِ : " هَكَذَا أَمَرَنَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ " هُوَ قَوْلُهُ : فَلَا نَزَالُ نَصُومُ حَتَّى نُكْمِلَ ثَلَاثِينَ ، وَالْأَمْرُ الْكَائِنُ مِنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ هُوَ مَا أَخْرَجَهُ الشَّيْخَانِ وَغَيْرُهُمَا بِلَفْظِ : { لَا تَصُومُوا حَتَّى تَرَوْا الْهِلَالَ ، وَلَا تُفْطِرُوا حَتَّى تَرَوْهُ فَإِنْ غُمَّ عَلَيْكُمْ فَأَكْمِلُوا الْعِدَّةَ ثَلَاثِينَ } وَهَذَا لَا يَخْتَصُّ بِأَهْلِ نَاحِيَةٍ عَلَى جِهَةِ الِانْفِرَادِ بَلْ هُوَ خِطَابٌ لِكُلِّ مَنْ يَصْلُحُ لَهُ مِنْ الْمُسْلِمِينَ
জেনে রাখ, (আমাদের কাছে) হুজ্জত (সুস্পষ্ট প্রমাণ) সাব্যস্ত হয় ইবন আব্বাস (রা)-এর মারফু' রেওয়ায়াত থেকে, তার ইজতিহাদ থেকে নয় যা লোকজন তার থেকে বুঝেছে এবং তাঁর বর্ণনায় যেটি এসেছে "এভাবে রাসূল (সা) আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন" সেটি তারই মন্তব্য; (এজন্যই তিনি বলেছেন): "আমরা সিয়াম পালন করে যাচ্ছি ত্রিশদিন পূর্ণ হওয়ার আগ পর্যন্ত"। রাসূল (সা)-এর নির্দেশটি নিহিত রয়েছে সেই হাদীসটিতে যা শায়খাইন (বুখারী ও মুসলিম) ও অন্যান্যদের কর্তৃক সংকলিত হয়েছে: "নতুন চাঁদ না দেখা পর্যন্ত সিয়াম পালন শুরু করবে না এবং তা না দেখা পর্যন্ত সিয়াম পালন বন্ধ করবে না; যদি আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকে তাহলে ত্রিশ দিনে (গণণা) পূর্ণ করবে"; এবং এই বিষয়টি সুনির্দিষ্টভাবে কোনো একটি অঞ্চলের লোকজনকে বুঝাচ্ছেন না বরং সমস্ত মুসলিমদেরকেই বুঝাচ্ছে।


 বিশ্বের ৫৭টি মুসলিম দেশ এবং সকল মুসলিমের প্রতিনিধিত্বকারী বিশ্ব মুসলিম সংগঠন ও, আই, সি-এর ফিকহ একাডেমী ১৯৮৬ সনের ১১-১৬ অক্টোবর জর্ডানের রাজধানী আম্মানে অনুষ্ঠিত শীর্ষ সম্মেলনে শতাধিক শরীয়াহ্‌ বিশেষজ্ঞের সর্ব সম্মতিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন যে, “বিশ্বের কোন এক দেশে চাঁদ দেখা গেলে সকল মুসলিমকে ঐ দেখার ভিত্তিতেই আমল করতে হবে।”

 http://www.newmoonbd.com/oic_decision.php






দেশ ব্যাপারটি কি ? দেশ ব্যাপারটি হলো একটি আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক সীমারেখা,যার উপর ভিত্তি করে একটি এলাকাকে নিজেদের বলে আখ্যায়িত করা হয়। মূলতঃ পৃথিবী আল্লাহর এবং তা সকল মানুষের জন্যে উম্মুক্ত। হযরত মুহাম্মদ(সাঃ) সারা পৃথিবীর সকল মানুষের জন্যে রসূল। তিনি নির্দিষ্ট কোনো গোত্র, সম্প্রদায়ের জন্যে নির্ধারিত নন। আর তাই তাঁর(সাঃ) সকল বক্তব্য পৃথিবীর সকল মানুষের জন্যে সমভাবে প্রযোজ্য। অতএব, চাঁদ দেখা সংক্রান্ত বিষয়টি সারা পৃথিবীর সকল মানুষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কোনো এলাকার লোক চাঁদ দেখতে ব্যর্থ হলে, ভিন্ন এলাকার মানুষের সাক্ষ্য গ্রহন করা হয়েছে এবং এখানে সেই লোকটি কত দূরবর্তী স্থানের লোক তা বিবেচনায় আনা হয়নি। এখানে আরেকটি বাস্তবতা হলো যোগাযোগের মাধ্যম। তৎকালীন সময়ে মানুষের বাহন ছিল ঘোড়া, গাধা, উট, পদযুগল ইত্যাদী। এগুলোর উপর ভিত্তি করে একজন মানুষের পক্ষে এক দিনে খুব বেশীদূর অগ্রসর হওয়া সম্ভবপর ছিলনা। ফলে যিনি চাঁদ দেখছেন তার পক্ষে দূরবর্তী অঞ্চলের মানুষকে জানানো সম্ববপর ছিলনা। আজকের দিনের মত যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে রেডিও, টেলিভিশন, ইন্টারনেট, টেলিফোন না থাকাতে তাদের পক্ষে দূরবর্তী অঞ্চলের মানুষের সাথে তাৎক্ষনিক যোগাযোগ রক্ষা করা সম্ভব ছিল না। ফলে, সন্ধ্যায় চাঁদ দেখা গেলে প্রথমে তা নিজ এলাকার লোকদেরকে জানিয়ে দেওয়া হত, তারপর পার্শ্ববর্তী এলাকার মানুষদেরকে জানানোর জন্যে ঘোড়া সওয়ার পাঠানো হত। প্রথম থেকেই এই নিয়ম চালু ছিল। কিন্তু ঘোড়া সওয়ারের পক্ষেও বহুদূর গমন করা সম্ভবপর ছিলনা। কিন্তু আমরা এখান থেকে একটি বিষয় বুঝতে পারি, তা হলো-কোনো এলাকায় চাঁদ দেখা গেলে যথাযথ গুরুত্বের সাথে অন্য এলাকার মানুষকে জানানো জরুরী, যাতে করে সকলে একসাথে রোজা ,ঈদ পালন করতে পারে।
ঘোড়ার মাধ্যমে যোগাযোগের এ মাধ্যমটির চেয়েও আরও উন্নত যোগাযোগ মাধ্যম পরবর্তী সময়ের খিলাফতের যুগে আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। সে সময়ে সমুদ্রবক্ষে জাহাজের নিরাপদে দিক চিনে চলাচলের সুবিধার্তে যে সকল লাইট হাউস বা বাতিঘর ছিল, আকাশে চাঁদ দেখা গেলে সেগুলিতে আলো জ্বালিয়ে দেওয়া হত। একটি লাইট হাউসে আলো জ্বললে সে খবর যখন অন্যটিতে পৌঁছাত ,তখন অন্যটিতেও আলো জ্বালিয়ে দেওয়া হত। এভাবে জনতা আলো জ্বলতে দেখে চাঁদ দেখার ব্যাপারটি বুঝতে পারত। এ প্রক্রিয়ায় যে সকল এলাকার মানুষ চাঁদ দেখার ব্যাপারটি বুঝতে পারত,সে সকল এলাকার মানুষেরা রোজা,ঈদ একসাথে পালন করত।
এখান আমরা একটু লক্ষ্য করলে বুঝতে পারব যে, আকাশে চাঁদ দেখা গেছে, এ সংবাদটি পায়ে হেটে অন্যদেরকে জানানো, ঘোড়ায় চড়ে জানানো, লাইট হাউসের মাধ্যমে জানানোর মধ্যে বিষয়ভিত্তিক কোনো পার্থক্য নেই বরং প্রযুক্তিগত পার্থক্য রয়েছে, যা প্রথম যুগ থেকেই গ্রহন করা হয়েছে। বেশী সংখ্যক মানুষকে দ্রুততার সাথে জানানোর জন্যে এ মাধ্যমগুলি প্রযুক্তি বিশেষ,যা সময়ের প্রেক্ষিতে পরিবর্তিত হয়েছে। এখানে উক্ত প্রযুক্তির একটিই উদ্দেশ্য ছিল, তা হলো-দ্রুততার সাথে অন্যদেরকে চাঁদ দেখার সংবাদটি জানানো।
আজকের এই প্রযুক্তির উৎকর্ষতার সময়ে যদি কেউ এক এলাকাতে চাঁদ দেখতে পায় এবং তা অন্য এলাকার লোকদেরকে টেলিফোনে, ইন্টারনেটে, টেলিভিশনে, রেডিওর মাধ্যমে জানিয়ে দেয়, তাহলে তা পূর্ববর্তী সময়ের পায়ে হাটা, ঘোড়ায় চড়া, লাইট হাউসের মাধ্যমে ঘটিত প্রচারণার সমপর্যায়েরই হবে। কারণ, এখানে উদ্দেশ্য একই। এ লক্ষ্যে কোনো ভৌগলিক সীমারেখা ইসলামে বিবেচ্য বিষয় নয়। বরং জাতীয়তাবাদী নীতিতে আবদ্ধ হয়ে মুসলিমদের ভূখন্ডকে ভৌগলিক বিভাজন করা সুস্পষ্ট হারাম। রাসুল (সাঃ) বলেছেন,
“যে ব্যক্তি জাতীয়তাবাদের (আসাবিয়্যার) প্রতি আহ্বান করে সে আমাদের অন্তর্ভূক্ত নয়।”
অতএব, যদি আরবের কোথাও চাঁদ দেখা যায়, তাহলে সে সংবাদ ভিন্ন এলাকায় পৌঁছে গেলে “চাঁদ দেখা গেছে” ব্যাপারটি উক্ত এলাকার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে। আবার ভিন্ন এলাকাতে চাঁদ দেখা গেলে সে সংবাদ আরবে পৌঁছলে, আরবের জন্যও এটি গ্রহনযোগ্য হবে। এভাবে সকল স্থানের ক্ষেত্রে ব্যাপারটি একই। চাঁদকে জাতীয়তাবাদের সংকীর্ণ ধারনার জালে জড়ানো যাবে না। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়:- ধরে নিলাম, ইরাকের সময়ের চেয়ে বাংলাদেশের সময় ৩ ঘন্টা কম, অর্থাৎ ইরাকে যখন মাগরিবের সময় হবে তার তিন ঘন্টা পর বাংলাদেশে মাগরিবের সময় হবে। সে অনুযায়ী ইরাকে চাঁদ দেখা গেলে বাংলাদেশের লোক সে সংবাদ বিকেলের দিকে জানতে পারবে এবং সন্ধ্যায় এখানে চাঁদ দেখা যাক বা না যাক ধরে নেওয়া হবে চাঁদ দেখা গেছে বা উদীত হয়েছে। এখানে আমরা ভিন্ন এলাকার মানুষের সাক্ষ্য গ্রহন করলাম সুন্নাহ অনুযায়ী। আবার এমনও হতে পারে, ইরাকের লোকেরা চাঁদ দেখতে পেলনা এবং এ সংবাদটিও আমরা বিকেলের দিকে জানতে পারব, তখন আমরা সন্ধ্যায় চাঁদ দেখার চেষ্টা করব। যদি এখানে চাঁদ দেখা যায়, তাহলে আমরা তাদেরকে এবং অন্যদেরকে জনাবো এবং তা গ্রহনীয় হবে। যদি এখানেও না দেখা যায় তবে আমাদের চাইতে যে সকল এলাকার সময় কম অর্থাৎ আরো পরে সন্ধ্যা হয়, তারা আকাশে চাঁদ খোঁজার চেষ্টা করবে এবং পেলে তা ঘোষিত হবে সকলের জন্যে। এখানে আরেকটি ব্যাপার উল্লেখ করার আছে :
পৃথিবীর এক প্রান্তের সাথে অপর প্রান্তের সময়ের সর্বোচ্চ পার্থক্য ১২ ঘন্টা। যদি আমরা বা অন্য কোনো অঞ্চলের মানুষেরা সেহরী করার নির্ধারিত সময় পার হবার পর , চাঁদ উদীত হবার ব্যাপারে জানতে পারে, তাহলে তাদের উপর উক্ত দিনের রোজা রাখার বাধ্যবাদকতা অর্পিত হয়না। আবার চাঁদ উদিত হয়েছে, এ সত্য সংবাদটি কারো কাছে অথবা কোনো এলাকার নিকট না পৌঁছালে তাদের উপরও রোজা রাখা বা অন্যদের সাথে ঈদ(যদি ঈদের চাঁদ দেখার সংবাদ তাদের কাছে না পৌঁছায়) পালন করার বাধ্যবাদকতা অর্পিত হয়না। সে পরিস্থিতিতে তাদেরকে নিজেদের প্রচেষ্টায় চাঁদ দেখতে হবে(অথবা ত্রিশ রোজা পূর্ণ করতে হবে), যেহেতু অন্য স্থান থেকে বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারনে তথ্য আসার সম্ভাবনা নেই। এ প্রসঙ্গে আমরা হাদীস থেকে জানব:
 হযরত মূসা ইবনে ইসমাইল কুরায়ব থেকে বর্ণিত- তিনি বলেন, উম্মে ফাযল বিনতে হারিস তাকে মুয়াবিয়ার কাছে শাম দেশে(সিরিয়া) পাঠান। তিনি বলেন, আমি সিরিয়া থাকা অবস্থায় রমজানের চাঁদ ওঠে এবং আমরা তা দেখি জুম্মার রাতে। অত:পর আমি রমজানের শেষের দিকে মদীনায় ফিরে আসি। ইবনে আব্বাস আমাকে সফর সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন এবং বিশেষ করে চাঁদের সম্পর্কে বলেন-“তোমরা রমজানের চাঁদ কখন দেখেছিলে ?” আমি বলি-জুম্মার রাতে দেখেছি। অত:পর তিরি জিজ্ঞেস করেন-“তুমি নিজেও কি তা দেখেছিলে ?” আমি বলি, হ্যাঁ এবং অন্যান্য লোকেরাও দেখেছে ও রোজা রেখেছে, এমনকি মুয়াবিয়াও রোজা রাখেন। ইবনে আব্বাস বলেন, আমরা চাঁদ দেখেছি শনিবার রাতে। সুতরাং আমরা ত্রিশদিন পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত রোজা রাখব অথবা শাওয়ালের চাঁদ না দেখা পর্যন্ত রোজা রেখে যাব। আমি বললাম, মুয়াবিয়ার দর্শন ও রোজা রাখা কি এ ব্যাপারে যথেষ্ট নয়? তিনি বলেন না, আমাদেরকে রসূল সা: এরকম করতে নিষেধ করেছেন। (সূত্র:আবু দাউদ ৩য় খন্ড/২৩২৬)
 
জাতীয়তাবাদ ইসলামের দৃষ্টিতে হারাম

বৃটিশরা দাগ টেনেছে মাটিতে আর কিছু মুসলিমরা সেই দাগ আকাশেও টেনে বলছে যে এই দাগের ভিতর চাঁদ আসলে এটা আমার আর তোমার দাগের ভিতর আসলে তোমার। কি মুসলিম ! কি ভয়ঙ্কর জাতিয়তাবাদ ! বৃটিশদের টানা দাগের প্রতি এদের কি সম্মান!

আমরা জানি, জাতীয়তাবাদ ইসলামের দৃষ্টিতে হারাম। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা বলেন,

وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلا تَفَرَّقُوا

তোমরা সকলে আল্লাহ্র রজ্জুকে শক্ত করে আকড়ে ধর এবং পরস্পর বিভক্ত হয়ো না। [সূরা আলে ইমরান: ১০৩]
রাসূল (সা) বলেন,

لَيْسَ مِنَّا مَنْ دَعَا إلى عَصَبِيةٍ

"যে জাতীয়তাবাদের দিকে আহ্বান করে সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়"। [আবু দাউদ]

তিনি (সা) আরো বলেন,

دَعُوْهَا فَإِنَّهَا مُنْتِنَةٌ
"এটা (জাতীয়তাবাদ) ছেড়ে দাও, নিশ্চয়ই এটা পঁচে গেছে"। [বুখারী]

সুতরাং, কোনো জাতি-রাষ্ট্রের সীমানা মুসলিম উম্মতের মধ্যে কোনো বিভেদ সৃষ্টি করেনা। শরীয়তের দৃষ্টিতে পৃথিবীর প্রত্যেক মুসলিম পরস্পর ভাই-ভাই এবং তাদের ভুমিগুলো একটি ভুমি হিসেবেই বিবেচিত হয়।


*** তাবেঈ ইবনে বাখতারী বলেন, একবার আমরা ওমরা করার জন্যে বের হলাম। যখন আমরা বাতনে নাখলা নামক স্থানে পৌঁছলাম, তখন সকলে মিলে চাঁদ দেখতে পেলাম। আমাদের মধ্যে কেউ বলল, এটি তিন দিনের চাঁদ, কেউ বলতে লাগল এটি দুই দিনের চাঁদ। পরে আমরা যখন ইবনে আব্বাসের সাথে সাক্ষাৎ করলাম এবং বললাম, আমরা রমজানের চাঁদ দেখেছি, কিন্তু আমাদের কেউ বলেছে এটি তিন দিনের ,কেউ বলেছে এটি দুই দিনের চাঁদ। ইবনে আব্বাস বললেন, তোমরা কোন রাতে দেখেছো ? আমরা বললাম,অমুক রাতে। তখন তিনি বললেন, রসূল সা: সেখান থেকে তারিখ গণনা করতেন, যে রাতে চাঁদ দেখতেন। ( সূত্র: সহীহ মুসলিম ৩য় খন্ড/২৩৯৭,তিরমিযী)


এখানে উল্লেখ্য যে, মদীনা থেকে তৎকালীন সিরিয়ার দূরত্ব এত বেশী ছিল যে, একই দিনের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে যোগাযোগ করা সম্ভবপর ছিলনা। ফলে, উভয় এলাকার মানুষ ভিন্ন তারিখে চাঁদ দেখে রোজা রেখেছে। পরের হাদীসটিতেও একই ব্যাপার ঘটেছে অর্থাৎ তাদের কাছে অন্য এলাকার কোনো তথ্য পৌঁছেনি,ফলে তাদেরকে নিজেদের মত করে চাঁদ দেখতে হয়েছে। যদি তাদেরকে ভিন্ন এলাকার কোনো লোক এসে “চাদ দেখা গেছে” এ সংবাদ দিত ,তাহলে তারা অবশ্যই তা গহন করতেন; পূর্বোক্ত হাদীস অনুযায়ী। এক্ষেত্রে শর্ত হল, যিনি/যারা চাঁদ দেখার বিষয়টি জানাচ্ছেন, তিনি/তারা বিশ্বাসযোগ্য কি না। যদি তিনি বা তারা বিশ্বাসযোগ্য হন তাহলে তার সাক্ষ্য গ্রহন করা হবে। বর্তমান কালে স্যাটেলাইট টেলিভিশন, ইন্টারনেটের কল্যানে চাঁদকে পৃথিবীর সকল এলাকাবাসীর সামনে সরাসরি উপস্থাপন করা যায়। সুন্নাহ অনুযায়ী এই চরম সত্য বিষয়টি গ্রহনযোগ্য হবার কথা। কিন্তু এটি গ্রহনযোগ্য না হলে একমাত্র আন্তর্জাতিক ভৌগলিক সীমারেখা বা রাজনৈতিক বিষয়টিই চাঁদ দেখা সংক্রান্ত বিষয়ের ক্ষেত্রে প্রধান বাঁধা হয়ে দাড়ায়, যা সরাসরি সুন্নাহ বিরোধী।
এছাড়া কিছু কিছু এলাকাতে(মেরু এলাকাতে) ৬ মাস দিন এবং ৬ মাস রাত হয়। নরওয়েতে কখনই রাত বা সন্ধ্যা হয়না এবং ইউরোপের কয়েয়কটি দেশে কখনও কখনও দিন ২৩ ঘন্টা পর্যন্ত দীর্ঘায়িত হয়ে থাকে। এ সমস্ত ক্ষেত্রে তাদেরকে ভিন্ন এলাকার তথ্যের সাহায্যে রোজা এবং ঈদ পালন করতে হবে/হয়। কেউ যদি বলে, প্রত্যেক দেশের মানুষকে চাঁদ দেখতে হবে, তাহলে তার কাছে জানতে চাইব, নরওয়ে, গ্রিনল্যান্ড ইত্যাদী দেশে এবং উত্তর মেরু, দক্ষিন মেরুতে থাকা সহীহ মুসলিমদের কি হবে? জাতীয়তাবাদী চাঁদ তাদের জাতিকে স্বীকৃতি দিলনা রোজা বা ঈদ পালনের ! নাকি রোজার পূর্বে তাদেরকে দেশ ত্যাগ করে ‘সময়মত চাঁদ ওঠে’ এমন দেশে পাড়ি জমাতে হবে? আবারও পূর্বোক্ত হাদীস পেশ করছিঃ-
*** রসূল সা: বলেন, তোমরা রোজা রাখবে না, যে পর্যন্ত না চাঁদ দেখতে পাও। একইভাবে তেমরা রোজা ভঙ্গ(ঈদ) করবে না,যে পর্যন্ত না শাওয়ালের চাঁদ দেখতে পাও। তবে যদি মেঘের কারনে তা তোমাদের কাছে গোপন থাকে,তবে শাবান মাস পূর্ণ করবে ত্রিশ দিনে। অপর বর্ণনায় আছে,তিনি সা: বলেন- মাস কখনও উনত্রিশ রাতেও হয়। (সূত্র: সহীহ বুখারী -৩য় খন্ড, ১৭৮৫-১৭৯০, সহীহ মুসলিম-৩য় খন্ড, ২৩৬৭-২৩৯৪)


রোজা রাখ চাঁদ দেখে এবং রোজা ভঙ্গ করবে চাঁদ দেখে। যদি মেঘের কারনে চাঁদ গোপন থাকে তবে সাবান মাস ত্রিশ দিনে পূর্ণ করবে। (সূত্র: সহীহ বুখারী ৩য় খন্ড, ১৭৮৫-১৭৯০, সহীহ মুসলিম ৩য় খন্ড, ২৩৬৭-২৩৯৪)
এখানে রসূল(সাঃ) সারা বিশ্বের সমস্ত মানুষকে উদেশ্যে করে এ বিধানটি শুনিয়ে দিচ্ছেন। ফলে তা সেভাবেই পালিত হবে। সারা বিশ্ব যদি মেঘে ঢেকে থাকে তবে চাঁদ দেখা যাবে না এবং সাবান মাস ত্রিশ দিনে পূর্ণ হবে। এছাড়া যদি কোনো দিন সম্পর্কে সন্দেহ সৃষ্টি হয় তাহলে রসূল(সাঃ) বলেন:-
যে ব্যক্তি সন্দেহের দিনে রোজা রেখেছে,সে আবুল কাশেমের (রসূল সা এর নাফরমানী করেছে। ( সূত্র: আবু দাউদ ৩য় খন্ড/২৩২৭, তিরমিযী, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ)
অনুরূপভাবে ‘ঈদের চাঁদ দেখা গেছে’ এই সংবাদ প্রকাশিত হলে, সকলকে একসাথে ঈদ পালন করতে হবে। কোনোভাবেই ঈদের দিনে রোজা রাখা যাবে না।
*** আবু সাঈদ খুদরী রা: থেকে বর্নীত, রাসুল (সাঃ) রোযার ঈদের দিন এবং কুরবানীর ঈদের দিন রোযা রাখতে নিষেধ করেছেন। (সূত্র: সহীহ সহীহ বুখারী ৩য় খন্ড/১৮৬৭,১৮৬৮ ও সহীহ মুসলিম ৩য় খন্ড/২৫৩৭-২৫৪২)।

রসূলুল্লাহ (সা) এর নিজ আমল :
রসূলুল্লাহ (সা) ২য় হিজরী থেকে ১০ম হিজরী পর্যন্ত সর্বমোট ৯ বার পবিত্র রমযান মাসের রোযা রেখে ছিলেন। সুতরং আমাদের গভীর দৃষ্টি দেয়া উচিৎ, (সা)-এর আমলের দিকে। রমযান মাসে রোযা রাখা এবং শাওয়াল মাসে ঈদ করার ক্ষেত্রে তিনি হাদীস দু’টির প্রতিফলন কিভাবে করেছেন। উল্লেখিত হাদীস কারীমা অনুযায়ী রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম কি নিজে চাঁদ দেখে রোযা রেখেছেন, ঈদ করেছেন? না কি অন্যের দেখার সংবাদের মাধ্যমেও রোযা রেখেছেন, ঈদ করেছেন? এ প্রসংগে পবিত্র হাদীসে যে প্রমাণ পাওয়া যায় তা হচ্ছে-
# আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন কিছু সংখ্যক মানুষ (রমযানের) নুতন চাঁদ দেখল। আমি রসূলুল্লাহ (সা)কে সংবাদ দিলাম যে আমিও উক্ত চাঁদ দেখেছি। ফলে রসূলুল্লাহ (সা) নিজে রোযা রাখলেন এবং মানুষকেও রোযা রাখতে নির্দেশ দিলেন। ---- (আবু দাউদ, দারেমী)- মিশকাত, পৃঃ-১৭৪
# আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: একজন মরুচারী মহানবী (সা)এর নিকট আসলো এবং বললো, আমি প্রথম চাঁদ অর্থাৎ রমযানের চাঁদ দেখেছি। তখন রসূলুল্লাহ (সা) তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি “আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই” একথা সাক্ষ্য দান কর? সে বলল হ্যাঁ, রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “মুহাম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম আল্লাহর রসূল” তুমি কি একথা সাক্ষ্য দান কর? সে বলল হ্যাঁ, রসূলুল্লাহ (সা) বললেন, হে বেলাল মানুষের কাছে ঘোষণা করে দাও তারা যেন আগামী দিন রোযা রাখে। ----- (আবু দাউদ পৃঃ-৩২০, তিরমিযী পৃঃ-১৪৮, নাসায়ী-২৩১, ইবনু মাজাহ পৃঃ-১১৯, মিশকাত পৃঃ-১৭৪)
# হযরত আবু উমাইর ইবনু আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত যে রসূলুল্লাহ (সা)এর নিকট একদল আরোহী আসল এবং তারা সাক্ষ্য দিল যে তারা গতকাল (শাওয়ালের) চাঁদ দেখেছে। ফলে রসূলুল্লাহ (সা) মানুষকে রোযা ছাড়ার আদেশ দিলেন। পরের দিন প্রাতঃকালে সকলেই ঈদগাহে সমবেত হলেন। -----(আবু দাউদ, নাসায়ী)- মিশকাত-১২৭


এখন প্রশ্ন হল সারা পৃথিবীতে দেখতে হবে নাকি এলাকা ভিত্তিক দেখতে হবে?
এই প্রশ্ন করার আগে আমার লেখার উপরের প্রথম অংশ আবার পড়ুন যেখানে বলা আছে আমরা চাঁদের কাঠামো অনুষরন করছি, সূর্যের নয়। চাঁদ উঠলেই চাঁদের দিন গননা শুরু হবে, না উঠলে আগের গননায় থাকবেন। যেখানে নতুন মাস আসেনি সেখানে নতুন মাস কিভাবে নিয়ে আসবেন? কথাটাকে একটু সূর্যের রেফারেন্স ফ্রেমে ঘুরিয়ে বলি, সূর্যই উঠে নাই, আপনি দাবী করছেন সকাল হয়ে গেছে। নতুন মাসের চাঁদই উঠে নাই, আপনি দাবী করছেন নতুন মাস শুরু হয়ে গিয়েছে। আসলে এটি ভুল দাবী।এলাকা ভিত্তিক চাঁদ দেখতে হবে সেটার আরেকটা প্রমাণ হল, হাদিস দুটিতে আকাশ মেঘাচ্চন্ন বলে শব্দ ব্যাবহার করা হয়েছে। এবং এই মেঘাচ্ছন্নের জন্য বুখারি শরিফের হাদিসটাতে ৩০ দিন পূর্ন করতে বলা হয়েছে।-এখন বলুন, জীবনে কোথাও শুনেছেন যে সারা পৃথিবীর আকাশ এক সাথে মেঘাচ্ছন্ন থাকে ? আবারো বলি এক সাথে কি সারা পৃথিবীর আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকে এমন কোন প্রমাণ কি আপনার কাছে আছে ? তাহলে আপনি নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করুন। উত্তর পেয়ে যাবেন। আরো প্রমাণ দেখুনঃ
#কুরাইব তাবেঈ বলেছেন, যে হারিসের কন্যা (লুবা-বা) তাকে শাম প্রদেশে সম্রাট মুআবিয়ার নিকট পাঠিয়ে দিলেন। অতঃপর আমি শামে এসে তাঁর প্রয়োজন সমাপন করলাম এবং আমার শামে থাকা অবস্থায় রামাযানের নতুন চাঁদ উদয় হল এবং আমি বৃহস্পতিবারের দিবাগত সন্ধ্যায় চাঁদ দেখলাম, তারপর মদীনা আসলাম; অতঃপর আমাকে আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) জিজ্ঞেসা করলেন যে, তোমরা (রামাযানের) চাঁদ কবে দেখেছ? আমি বললাম, জুমুআ রাত্রিতে; পুনরায় বললেন যে, তুমি নিজে দেখেছ? আমি বললাম, জি হ্যাঁ এবং অন্যান্য লোকেও দেখেছে এবং মুআবিয়া ও শামবাসীরা রোযা রেখেছেন। ইবনে আব্বাস (রাঃ) বললেন, আমরা কিন্তু শুক্রবারের দিবাগত সন্ধ্যায় চাঁদ দেখেছি, অতএব আমরা রোযা রাখতেই থাকব। ৩০-এ পর্যন্ত কিংবা ৩০শের পূর্বে ২৯শে চাঁদ দেখা পর্যন্ত। আমি বললাম, আপনি কি মুআবিয়ার চাঁদ দেখা ও তাঁর রোযা রাখার উপর নির্ভর করতঃ রোযা ও ঈদ করবেন না? ইবনে আব্বাস (রাঃ) বললেন, না; এটাই আমাদেরকে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আদেশ দিয়েছেন ।" [মুসলিম শরিফ খন্ড ৬, হাদিস -২৩৯১]
অর্থাৎ ,আমরা আপন দেশের লোকের চাঁদ দেখার উপর নির্ভর করব; অন্যান্য দূর দেশবাসীদের চাঁদ দেখাকে আমরা যথেষ্ট মান্য করব না।


অত্র হাদিসের ব্যাখ্যায় মিশকাত শরীফের উক্ত পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে- অর্থাৎ তারা ঈদের নামাজের জন্য ঈদগাহে সমাবেত হল। আল্লামা মাজহার বলেন যে ঐ বছর মদীনা শরীফে ২৯শে রমযান দিবাগত রাতে শাওয়ালের চাঁদ দেখা যায়নি। ফলে মদীনা বাসী ৩০ রমযানের রোযা রেখে ছিলেন। এমতাবস্থায় ঐ দিন দ্বিপ্রহরে একদল ছাওয়ারী দূর থেকে আসল এবং তারা সাক্ষ্য দিল যে, নিশ্চয়ই তারা ২৯ তারিখ দিবাগত রাতে নুতন চাঁদ দেখেছে। অতপর, রসূলুল্লাহ (সা) তাদের এ সংবাদ গ্রহণ করে সকলকে রোযা ভঙ্গের নির্দেশ দিলেন এবং পরের দিন (২রা শাওয়াল) ঈদের নামায পড়ার নির্দেশ দিলেন।
উপরোক্ত সকল হাদিস হতে আমরা যা বুঝতে পারলাম তা হল :
১. মাস প্রমাণের জন্য সকলের চাঁদ দেখা জরুরী নয় বরং একজন ন্যায়পরায়ণ মুসলিমের দেখাই সকলের আমলের জন্য যথেষ্ট হবে।
২. নিজ এলাকার আকাশে নুতন চাঁদ দেখতে পাওয়া না গেলে পার্শ্ববর্তী এলাকার সংবাদ গ্রহণযোগ্য ।
৩. পার্শ্ববর্তীদের চাঁদ দেখার সংবাদ পেলে অন্য সকলের উপর আমল জরুরী হবে।
বিশ্ব বিখ্যাত গ্রন্থ ”হাশিয়া-ই-তাহতাবী” শরীফের ভাষ্য হচ্ছে- "ঈদুল আযহাসহ সকল মাসের চাঁদের হুকুম শাওয়ালের চাঁদের হুকুমের মতোই। কোন উদয় স্থলে চাঁদ দেখা গেলে দুনিয়ার সকল স্থানের মানুষের উপরই আমল জরুরী হবে। যদি চাঁদ উদয়ের সংবাদ পৌঁছে দুইজন সাক্ষীর সাক্ষ্যে, অথবা কাযীর ফয়সালার উপরে দুইজন সাক্ষ্য দেন, অথবা উদয়ের সংবাদটি ব্যাপক প্রসিদ্ধি লাভ করে।" ----- (হাশিয়া-ই-তাহতাবী শরীফ, পৃঃ-৩৫৯)


ইমাম আবু হানিফা রহ. এর বক্তব্য ও এটাই এবং তিনিই সঠিক ।
পৃথিবী একটা, চাঁদ একটা, কোরআন একটা, সমস্ত মুসলিম একজাতি, সবাই এক নবীর উম্মাত, তাহলে ঈদ কেন তিন দিনে করব ? সন্দেহ নিরসনের জন্য বলতে হয় হানাফী মাজহাবসহ তিনটি মাজহাবের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হলো: নতুন চাঁদ উদয়ের স্থানের বিভিন্নতার কোন গুরুত্ব নেই এবং সর্বপ্রথম হেলালকেই সারা বিশ্বের সকলের অনুসরণ করতে হবে ।
ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) এর অভিমতঃ-
১. যে কোন একটি দেশে নতুন চাঁদের উদয় প্রমানিত হলে বিশ্বের সকল মানুষের উপর তার অনুসরন জরুরী হয়ে পড়ে [উৎস: আল মুখতার ১ম খন্ড ১২৯ পৃঃ / ফতহুল কাদীর (শেরহে ফাতহুল কাদীয়সহ) ১ম খন্ডঃ পৃ ২৪৩/মারাকীন ফালাহ পৃঃ ৫৪০-৫৪১/ আল-বাহরুর রায়েক ২য় খন্ড পৃঃ ২৯০]
২. আর উদয়ের স্থান ও সময়ের বিভিন্নতার কোন গুরুত্ব নেই । (উৎসঃ কাদী খান ১ম খন্ডঃ পৃঃ ১৯৮/ মাজমাউল আনহুর ১ম খন্ড পৃঃ২৩৯ / আল মুখতার ১ম খন্ড পৃঃ ১২৯ আল-ফাতওয়া আল হিন্দিয়াহ ১ম খন্ড, পৃঃ১৯৮/ আল বাহরুর রায়েক ২য় খন্ড পৃঃ ২৯০/ ফাতহুল কাদীর ২য় খন্ড পৃঃ ২৪৩/রদ্দুল মুহতার (শামী) ২য় খন্ড পৃঃ ৩৯৩)
৩. যদি পৃথিবীর পশ্চিমাংশের বাসিন্দারা রমজান মাসের নতুন চাঁদ দেখেন তাহলে তাদের এ দেখাতেই পূর্বাংশের লোকদের উপর (রোজা ও ঈদ) ওয়াজিব হয়ে যাবে (উৎসঃ আল-বাহুরুর রায়েক ২য় খন্ড পৃঃ ২৯০ / মাজমাউল আনহুর ১ম খন্ড ২৩৯ পৃঃ আল হিন্দিয়াহ (ফাতোয়ায়ে আলমগীরী) ২য় খন্ড ১৯৮-১৯৯ পৃঃ। ফাতহুল কাদীর ২য় খন্ড ২৪৩ পৃঃ। বাজাজিয়াহ ৪/৯৫)
সুতরাং হানাফী মাযহাবের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হলোঃ পৃথিবীর যে কোন দেশেই নতুন চাঁদ উদয় প্রমানিত হয়ে নির্ভরযোগ্য সূত্রে নতুন চাঁদ উদয়ের খবর দূরবর্তী কোন দেশে পৌছে তাহলে সে দেশের মুসলিমদের চাঁদের সাথে সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় উৎসবসমূহ পালন করতে হবে । উল্লেখ্য, বাংলাদেশের ৯০% -এর বেশী মুসলিম হানাফী মাযহাবের অনুসারী ।
ইমাম মালিক (রহঃ) এর অভিমতঃ-
১. যখন বসরা শহরবাসী রমজানের নতুন চাঁদ দেখবে, অতঃপর তা কুফা, মদীনাও ইয়েমেনবাসীদের কাছে পৌছবে তাহলে ইমাম মালিক (রহঃ) থেকে তাঁর শিষ্যদ্বয় ইবনুল কাসিম ও ইবনে ওয়াহাবের বর্ণনামতে শেষোক্ত দেশবাসীর প্রতিও ওয়াজিব হয়ে যাবে । অথবা যদি বাদ পড়ে তবে সে রোযা কাযা করতে হবে (উৎস আল-মুনতাকা-শরাহল মুয়াত্তা ২য় খন্ড পৃঃ ৩৭)
২. এবং রোযা রাখার নির্দেশ ব্যাপকভাবে সকল দেশকে শামিল করবে । চাই সে দেশ কাছে হোক বা বহুদুরে হোক (উৎসঃ শরহুজ জুরকানী ২য় খন্ড পৃঃ ১৯২/ আশ্-শরহুছ ছগীর ২য় খন্ড পৃঃ ৪/ ফাতহুর রাহীম ১ম খন্ড পৃঃ ১৩০)
সুতরাং মালিকী মাযহাবের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হলোঃ নতুন চাঁদ উদয় প্রমানিত হয়ে নির্ভরযোগ্য সূত্রে চাঁদ উদয়ের খবর দূরবর্তী কোন দেশে পৌছে তাহলে সে দেশের মুসলিমদের চাঁদের সাথে সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় উৎসব সমূহ পালন করতে হবে । উল্লেখ্য, হযরত মালিক (রাঃ) ছিলেন সাহাবী ।
ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহঃ) এর অভিমতঃ-
১. কোন একটি দেশের লোকেরা নয়া চাঁদ দেখবে সকল দেশের লোকদের উপর রোযা ফরজ হয়ে পড়ে (উৎসঃ মুঘনী পৃঃ ৭৯/ আররদুন নাদী শরহ কাফীল মরতাদী পৃঃ ১৬১/ জাদুল মুসতাকনে পৃঃ ৭৮ /আস-সালসাবীল ১ম খন্ড পৃঃ২০২ / উমদাতুল ফিকহ- পৃঃ৪৯)
২. চাই সে দেশ কাছে হোক বা দূরে হোক (উৎস: উদমাতুল ফিকহ- পৃঃ ৪৯ / মুযনী পৃঃ ৭৯)
৩. চাই চাঁদ উদয়ের স্থান ও কাল ভিন্নই হোক। (উৎসঃ উমদাতুল ফিকহে পৃঃ ৪৯)
সুতরাং হাম্বলী মাযহাবের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হলোঃ নতুন চাঁদ উদয় প্রমানিত হয়ে নির্ভরযোগ্য সূত্রে চাঁদ উদয়ের খবর দূরবর্তী কোন দেশে পৌছে তাহলে সে দেশের মুসলিমদের চাঁদের সাথে সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় উৎসব সমুহ পালন করতে হবে ।
শাফেয়ী মাযহাবঃ-যদি চাঁদ কোন এক দেশে দেখা যায় অথচ অন্য দেশে দেখা গেল না, তাহলে দেশ দুটি কাছাকাছি হয় তাহলে উভয় দেশ এক দেশের মতো গন্য হবে ।
আর দূরবর্তী হয় তাহলে দুটি মত রয়েছে । তার মধ্যে শুদ্ধতর মত হলো এক্ষেত্রে অন্য দেশের লোকদের প্রতি এর হুকুম বর্তাবে না (উৎসঃ রওদাতুত্তালেবীন ২য় খন্ড পৃঃ ৩৪৮/ মাতনুল মিনহাজ মা’মুযনিল মুহতাজ ১ম খন্ড পৃঃ ৪২২। আল-মুহাজ্জাব ১ম খন্ড পৃঃ ১৭৯ শরহমুসলিম (লিন্-নব্বী) ৭ম খন্ড, ১৯৭ পৃঃ। এহইয়াউ উলুমিদ্দীন ১ম খন্ড পৃঃ ২৩২)
সুতরাং পৃথিবীর যে কোন স্থানে যে কোন ভাবে চাঁদ দেখা প্রমানিত হলে সারা বিশ্বে মুসলিমদের উপর ইসলামের বিধি-বিধান পালন করা এবং হিজরী সন গণনা করা সম্পর্কে একমাত্র ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) ছাড়া বাকী সব ইমাম ঐক্যমত পোষন করেছেন । কিন্তু পরবর্তীতে শাফেরী মাযহাবের মুজতাহিদরা (গবেষক) এ নিয়ে গবেষণা করে বিভিন্ন ধরনের মত পোষন করেছেন ।
শাফেয়ী মাযহাবে দ্বিমত থাকায় এবং বাকী তিন মাযহাব ঐক্যমত পোষন করায় পৃথিবীর যে কোন স্থানে যে কোন ভাবে চাঁদ দেখা প্রমানিত হলে যারা বিশ্বে মুসলিমদের উপর ইসলামের বিধি-বিধান পালন করা এবং হিজরী সন গণনা করা অবশ্য করণীয় (ওয়াজিব) ।




http://www.newmoonbd.com/faq.php
http://www.newmoonbd.com/what_quran_says.php
http://www.newmoonbd.com/direction_of_hadis.php
http://www.newmoonbd.com/fikhs_decision.php
http://www.newmoonbd.com/fikhs_decision_1.php
http://sottersondhane.blogspot.com/2013/05/blog-post_25.html

http://sottersondhane.blogspot.com/2013/05/blog-post_8590.html

http://sottersondhane.blogspot.com/2013/05/blog-post_8475.html

http://www.kitabummuneer.com/next/Global%20Moon%20Sighting%20Fatwa%20in%20English.pdf

http://returnofislam.blogspot.com/2011/03/ramadan-unity.html

http://khilafah.com/index.php/multimedia/books/10055-book-all-muslims-are-obliged-to-start-ramadhan-on-the-same-day"

 ১ম অংশ:

যারা নিজ নিজ দেশের চাঁদ অনুযায়ী রোজা ও ঈদ পালন করে থাকেন তাদের কাছে আমাদের প্রশ্নঃ

১) দেশের সীমানা কতটুকু হবে তা কোরআন ও সুন্নাহ অনুযায়ী পেশ করবেন?

২। নিজ নিজ দেশের চাঁদ অনুযায়ী রোজা ও ঈদ পালন করতে হবে এর স্বপক্ষে আল্লাহর কিতাব বা রাসূল সাঃ এর হাদিস থেকে দালিল পেশ করবেন। যেমন ভাবে আমরা করেছি। আমরা চাই দলিল, একই দিনে রোজা ও ঈদ পালণ করতে হবে না, এর দলিল কি?

৩। আপনাদের বক্তব্য অনুযায়ী "সারা বিশ্বের সাথে একই সময়ে আমরা ইফতার, সেহরী ও নামাজ আদায় করি না"। এই জন্য আপনারা সারা বিশ্বের সাথে একই বারে/দিনে ঈদ পালন করতে চান না। তাহলে আপনাদের নিকট আমাদের প্রশ্ন, ঢাকার মানুষের সাথে চট্টগ্রামের মানুষ একই সময়ে ইফতার, সেহরী ও নামাজ আদায় করে না। তবে কেন রোজা ও ঈদ একই বারে/দিনে পালন করেন?

৪। সূর্যের সময়ের হিসেবে উল্লেখিত দুই শহর অর্থ্যাৎ ঢাকা ও চট্টগ্রাম এর সময়ের পার্থক্য বজায় রেখে যদি আপনারা একই বারে/দিনে রোজা ও ঈদ পালন করতে পারেন। তবে কেন সারা বিশ্বের সাথে সূর্যের সময়ের পার্থক্য বজায় রেখে একই দিনে/বারে রোজা ও ঈদ পালন করতে পারেন না?

৫।চট্টগ্রামে বা পঞ্চগডে বা সিলেটে বা সাতক্ষীরায় চাঁদ দেখা গেলে এবং ঢাকায় চাঁদ না দেখা গেলে, ঢাকায় চাঁদ না দেখেও ঐসব এলাকার চাঁদ দেখার সংবাদ শুনে ঐসব এলাকার সাথে একই বারে রোযা বা ঈদ করছেন, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে চাঁদ দেখা গেলে এবং ঢাকায় চাঁদ না দেখা গেলে, মধ্যপ্রাচ্যের চাঁদ দেখার সংবাদ শুনে ঢাকায় একই বারে রোযা বা ঈদ কেন করতে পারছেন না???

৬।যদি বলেন, ঢাকার সাথে মধ্যপ্রাচ্যের দূরত্ব, ঢাকার সাথে চট্টগাম বা পঞ্চগড বা সিলেট বা সাতক্ষীরার দূরত্বের চেয়ে বেশি, তাহলে দূরত্ব কতদূর হলে রোজা বা ঈদ একই দিনে/বারে করা যাবে, তা দলিল সহ স্পষ্ট করে বলবেন কি??

৭।যদি বলেন, ঢাকার সাথে মধ্যপ্রাচ্যের সময়ের পার্থক্য, ঢাকার সাথে চট্টগাম বা পঞ্চগড বা সিলেট বা সাতক্ষীরার সময়ের পার্থক্যের চেয়ে বেশি, তাহলে সময়ের পার্থক্য কতদূর হলে রোজা বা ঈদ একই দিনে/বারে করা যাবে, তা দলিল সহ স্পষ্ট করে বলবেন কি??

৮। কেন মুসলিম বিশ্বে একই বারে/রাতে শবে কদর পালিত হয়না? শবে কদরের রাত কি একটা নাকি দুইটা? ৩০ পারা কুরআন একত্রে যে রাতে নাযিল হয়েছিল সেটাই কদরের রাত। ৩০ পারা কুরআন কি মধ্যপ্রাচ্যে এক রাতে আর বাংলাদেশে তার পরের রাতে অর্থাৎ দুই রাতে নাযিল হয়েছে?

৯। রাসূল (স) এর হাদিস দ্বারা প্রমানিত, কিয়ামত ১০ ই মুহাররম শুক্রবারে হবে। বাংলাদেশের সরকারী গণনা অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে যদি শুক্রবারে ১০ ই মুহাররম হয় তবে বাংলাদেশে সেদিন ৯ ই মুহাররম শুক্রবার। আবার যদি বাংলাদেশে শুক্রবারে ১০ ই মুহাররম হয় তবে মধ্যপ্রাচ্যে সেদিন ১১ ই মুহাররম শুক্রবার। কিয়ামত মধ্যপ্রাচ্যের ১০ ই মুহাররম শুক্রবারে হলে বাংলাদেশে সেদিন ৯ ই মুহাররম থাকার কারনে কিয়ামত হবেনা। আর বাংলাদেশের ১০ ই মুহাররম শুক্রবারে কিয়ামত হলে মধ্যপ্রাচ্যে ১১ ই মুহাররম থাকার কারনে কিয়ামত হবেনা। তাহলে কিয়ামত কোন দেশের ১০ ই মুহাররম শুক্রবার অনুযায়ী হবে? বাংলাদেশে কিয়ামত কি মধ্যপ্রাচ্যের একদিন পরে হবে আর আমরা কি তা টি.ভি তে দেখব?

১০।বাংলাদেশে মধ্যপ্রাচ্যের একদিন পরে রোজা ঈদ করলে এই অবস্হা হয়: বাংলাদেশ থেকে কেউ রোযা শুরু করে রমযান মাসের যে কোন দিন মধ্যপ্রাচ্যে গিয়ে সেখানে ঈদ করলে তার রোযা ২৮ বা ২৯ টি হয়, আবার মধ্যপ্রাচ্য থেকে কেউ রোযা শুরু করে রমযান মাসের যে কোন দিন বাংলাদেশে এসে এখানে ঈদ করলে তার রোযা ৩০ বা ৩১ টি হয়। অথচ ২৮ বা ৩১ রোজার বিধান ইসলামে নাই। হাদীস শরীফে বলা হয়েছে আরবী মাস ২৯-এর কম হবেনা এবং ৩০-এর বেশী হবেনা। এক্ষেত্রে সমাধান কি?? দলিল সহ জানতে চাই।

১১। অনেকেই বলেন নামাজের ওয়াক্ত মধ্যপ্রাচ্যে ও বাংলাদেশে এক নয় তাহলে শবে কদর এক বারে/রাতে হবে কিভাবে। তাদেরকে বলি, নামাজের ওয়াক্ত এবং সেহরি ইফতার হয় সূর্য অনুযায়ী কিন্তু যে কোন আরবী মাস শুরু হয় চাঁদ অনুযায়ী। সূর্য ও চাঁদের হিসাব আলাদা। নামাজের ওয়াক্ত এবং সেহরি ইফতার কি চাঁদ অনুযায়ী হয়? আরবী মাস কি সূর্য অনুযায়ী হয়?

১২। সময়ের পার্থক্য বজায় রেখে যদি সারা পৃথিবীতে জুম্মা একই দিনে/বারে(শুক্রবার)পড়া যায় তবে সময়ের পার্থক্য বজায় রেখে সারা পৃথিবীতে ঈদের নামাজ কেন একই দিনে/বারে পড়া যাবে না?

১৩। আরাফার দিন হচ্ছে সেটাই যেদিন হাজীগন আরাফার মাঠে থাকেন। তার পরদিন হাজীগন আরাফার মাঠে থাকেন না। তাহলে যেদিন হাজীগন আরাফার মাঠে থাকেন না সেদিন আরাফার দিন কিভাবে হয়?

১৪।যদিও ঈদের দিন রোযা রাখা হারাম তবুও অনেক জায়গাতেই এমন বর্ডার/দেশের সীমারেখা (মানুষের তৈরী, আল্লাহর দেয়া নয়) আছে, যার একপাশে রোযা এবং অন্যপাশে ঈদ হচ্ছে একই দিনে, নিজ দেশের আকাশসীমায় আলাদা চাঁদ দেখার কারনে, তাহলে সেই বর্ডার এর মানুষ কি রোজা করবে নাকি ঈদ করবে?? ব্রিটিশের দেয়া বর্ডার অনুযায়ী কেন মুসলিমরা রোযা ঈদ করবে??


হাদীস শরীফের বক্তব্য

চাঁদ দেখার ব্যাপারে রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম থেকে যতগুলো হাদীস বর্ণিত হয়েছে তার মূল বক্তব্য বহন করছে আলোচিত হাদীস দু’টি। এ কারণেই চাঁদের তারিখ নির্ভর সকল ইবাদাত পালনের তারিখ নির্ধারণের ক্ষেত্রে সকল ফকীহ ও আলেমগণ নিজ নিজ মতের সমর্থনে অত্র হাদীস দু’টিকে দলীল হিসেবে পেশ করে থাকেন। গুরুত্বপূর্ণ উক্ত হাদীস দু’টি হচ্ছে-

এক, রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম ইরশাদ করেন-

-لاتصوموا حتى تروه ولاتفطروا حتى تروه

তোমরা চাঁদ না দেখে রোযা রাখবেনা এবং চাঁদ না দেখে রোযা ছাড়বেনা (ঈদ করবেনা)।
--- (বুখারী শরীফ)

দুই, রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম আরো ইরশাদ করেন-

-صوموا لرؤيته وافطروا لروؤيته

অর্থাৎ চাঁদ দেখার ভিত্তিতে তোমরা রোযা রাখ এবং চাঁদ দেখার ভিত্তিতে তোমরা রোযা ছাড়, ঈদ কর।
----- (মুসলিম শরীফ)

যে সকল ফকীহ ও আলেমগণ সমগ্র বিশ্বে একই দিনে আমলের পক্ষে ফাতওয়া দিয়েছেন তারা নিজেদের মতের সমর্থনে অত্র হাদীস দু’টিকে দলীল হিসেবে পেশ করেছেন। তাদের যুক্তি হল হাদীস দু’টির মধ্যে “তোমরা” বলে সম্বোধন দেশ মহাদেশের সীমানা পেরিয়ে সমগ্র বিশ্ববাসীর জন্যে ব্যাপক অর্থবোধক সম্বোধন।

রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম-এর নিজ আমল

রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম তাঁর পবিত্র হায়াতে ২য় হিজরী থেকে ১০ম হিজরী পর্যন্ত সর্বমোট ৯ বার পবিত্র রমযান মাসের রোযা রেখে ছিলেন। সুতরং আমাদের গভীর দৃষ্টি দেয়া উচিৎ, রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম-এর পবিত্র আমলের দিকে। রমযান মাসে রোযা রাখা এবং শাওয়াল মাসে ঈদ করার ক্ষেত্রে তিনি তাঁর পবিত্র আমলে বর্নিত হাদীস দু’টির প্রতিফলন কিভাবে করেছেন। উল্লেখিত হাদীস কারীমা অনুযায়ী রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম কি নিজে চাঁদ দেখে রোযা রেখেছেন, ঈদ করেছেন? না কি অন্যের দেখার সংবাদের মাধ্যমেও রোযা রেখেছেন, ঈদ করেছেন? এ প্রসংগে পবিত্র হাদীস শরীফে যে প্রমাণ পাওয়া যায় তা হচ্ছে-

  "হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন কিছু সংখ্যক মানুষ (রমযানের) নুতন চাঁদ দেখল। আমি রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম-কে সংবাদ দিলাম যে আমিও উক্ত চাঁদ দেখেছি। ফলে রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম নিজে রোযা রাখলেন এবং মানুষকেও রোযা রাখতে নির্দেশ দিলেন।"
---- (আবু দাউদ, দারেমী)- মিশকাত, পৃঃ-১৭৪

এমনি ভাবে হাদীস শরীফে আরো বর্ণিত আছে-

"আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিআল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: একজন মরুচারী মহানবী সল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম-এর নিকট আসলো এবং বললো, আমি প্রথম চাঁদ অর্থাৎ রমযানের চাঁদ দেখেছি। তখন রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি “আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই” একথা সাক্ষ্য দান কর? সে বলল হ্যাঁ, রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “মুহাম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম আল্লাহর রসূল” তুমি কি একথা সাক্ষ্য দান কর? সে বলল হ্যাঁ, রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম বললেন, হে বেলাল মানুষের কাছে ঘোষণা করে দাও তারা যেন আগামী দিন রোযা রাখে।"
----- (আবু দাউদ পৃঃ-৩২০, তিরমিযী পৃঃ-১৪৮, নাসায়ী-২৩১, ইবনু মাজাহ পৃঃ-১১৯, মিশকাত পৃঃ-১৭৪)

হাদীস শরীফে আরো বর্ণিত আছে-

"হযরত আবু উমাইর ইবনু আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত যে রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম-এর নিকট একদল আরোহী আসল এবং তারা সাক্ষ্য দিল যে তারা গতকাল (শাওয়ালের) চাঁদ দেখেছে। ফলে রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম মানুষকে রোযা ছাড়ার আদেশ দিলেন। পরের দিন প্রাতঃকালে সকলেই ঈদগাহে সমবেত হলেন।"
-----(আবু দাউদ, নাসায়ী)- মিশকাত-১২৭

অত্র হাদিসের ব্যাখ্যায় মিশকাত শরীফের উক্ত পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে- অর্থাৎ তারা ঈদের নামাজের জন্য ঈদগাহে সমাবেত হল। আল্লামা মাজহার বলেন যে ঐ বছর মদীনা শরীফে ২৯শে রমযান দিবাগত রাতে শাওয়ালের চাঁদ দেখা যায়নি। ফলে মদীনা বাসী ৩০ রমযানের রোযা রেখে ছিলেন। এমতাবস্থায় ঐ দিন দ্বিপ্রহরে একদল ছাওয়ারী দূর থেকে আসল এবং তারা সাক্ষ্য দিল যে, নিশ্চয়ই তারা ২৯ তারিখ দিবাগত রাতে নুতন চাঁদ দেখেছে। অতপর, রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম তাদের এ সংবাদ গ্রহণ করে সকলকে রোযা ভঙ্গের নির্দেশ দিলেন এবং পরের দিন (২রা শাওয়াল) ঈদের নামায পড়ার নির্দেশ দিলেন।

অত্র হাদীস তিনটিতে রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম-এর নিজ আমল দ্বারা নিম্নোক্ত বিষয় গুলো প্রতিষ্ঠিত হয়।

এক, মাস প্রমাণের জন্য সকলের চাঁদ দেখা জরুরী নয় বরং একজন ন্যায়পরায়ণ মুসলিমের দেখাই সকলের আমলের জন্য যথেষ্ট হবে।
দুই, নিজ দেশের আকাশে নুতন চাঁদ দেখতে হবে এমন শর্ত করা যাবে না।
তিন, দূরবর্তীদের চাঁদ দেখার সংবাদ পেলে অন্য সকলের উপর আমল জরুরী হবে।

ফিকহী দলীল

ফাতওয়ায়ে ইবনু তাইমিয়্যা গ্রন্থের ফাতওয়া হচ্ছে-
-يشمل كل من بلغه رؤية الهلال من اى بلد او اقليم من غير تحديد مسافة اصلا
অর্থাৎ নব চাঁদ উদিত হওয়ার সংবাদ যতটুকু পৌঁছবে ততটুকু তার আওতাভূক্ত হবে। তা কিছুতেই দূরত্বের কারণে কোন দেশ, মহাদেশ বা অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকবে না।
----- (ফাতওয়ায়ে ইবনু তাইমিয়্যা, খন্ড-২৫, পৃঃ-১০৭) অথবা
.......তামামুল মিন্নাহ ১/৩৯৮

বিশ্ব মানের ফিকহ গ্রন্থ আল ফিকহুস্ সুন্নাহ এর সিদ্ধান্ত হচ্ছে-
' জমহুর ফুকাহা গনের সিদ্ধান্ত হচ্ছে চাঁদের উদয়স্থলের ভিন্নতা গ্রহণীয় নয়। অতএব যখনই কোন দেশে চাঁদ দেখা প্রমাণিত হবে তখনই অন্য সকল দেশে রোযা ফরয হয়ে যাবে। কেননা রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম এরশাদ করেছেন “চাঁদ দেখার প্রমাণ সাপেক্ষে তোমরা রোযা রাখ এবং চাঁদ দেখার প্রমাণ সাপেক্ষে তোমরা রোযা ছাড়, ঈদ কর”। এখানে তোমরা বলে সম্বোধন দেশ মহাদেশ নির্বিশেষে সকল উম্মতের জন্য عام ব্যাপক অর্থবোধক। অতএব উম্মতের মধ্য থেকে যে কেউ যে কোন স্থান থেকে চাঁদ দেখুক উক্ত দেখাই সকল উম্মতের জন্য দলীল হবে। এ মত পোষণ করেছেন হযরত ইকরামা, কাসেম ইবনে মুহাম্মাদ, সালেম এবং ইসহাক রহমাতুল্লাহি আলাইহিম। হানাফী ফকীহগণের এটাই বিশুদ্ধমত।'
--- (আল-ফিকহুস্ সুন্নাহ, খন্ড-১, পৃঃ-৩০৭) অথবা
--- (আল-ফিকহুস্ সুন্নাহ, খন্ড-২, পৃঃ-৭)

উপমহাদেশের প্রখ্যাত আলেম ও গবেষক আল্লামা আশরাফ আলী থানভী (রহঃ)-এর ভাষ্য নিম্নরূপঃ-
"এক শহরের চাঁদ দেখা অন্য সকল শহর বাসীদের জন্য গ্রহণীয় হবে। ঐ শহরগুলোর সঙ্গে চাঁদ দেখা শহরের যত দুরত্বই হোকনা কেন। এমনকি সর্ব পশ্চিমের চাঁদ দেখার সংবাদ সর্ব পূর্বের মানুষের নিকট গ্রহণযোগ্য পদ্ধতিতে পৌছলে ঐ দিনই তাদের উপর রোযা রাখা ফরয হবে।"
----- (বেহেশতী- জেওর, খন্ড-১১, পৃঃ-৫১০)

Hakeem-ul-Umat Mujadid-e-Milat Hazrat Hazrat Maulana Ashraf Ali Thanvi (RA) has stated in favor of Global Moon Sighting in his famous book ‘Baheshti Zewar’: “First Issue: The report of moon sighting in one city is also an evidence for the other city. No matter how much distance there may be in both of these cities. To the extent that if the moon is sighted in the farthest corner of the west, and its news is transmitted in a reliable method, then it will become incumbent on the people living in the farthest corner of the east. (Behishti Zewar, Section 11, pg 104, part 4)(Referenced from ‘Behr Al Raqeeq, pg 270, vol.2; Fatwa Alamghiri pg 97, vol1).

“the sighting of one city is a premise for another city, the distance between the two cities does not matter, if the reports are transmitted according to the principles of Shariah then the sighting of the people of the east has to be valid for the people of the west and vice-versa.” (Dur-e-Mukhtar, ‘Rad-ul-Mukhtar’). (Elim Al Fiqah part 3, pg 17,18)

"চাঁদ দেখার ভিন্নতা গ্রহনীয় নয় । বরং প্রথম দিনের দেখার দ্বারাই সমগ্র পৃথিবীতে এক কেন্দ্রিক তারিখ গণনা করে, একই দিনে একই তারিখে আমল করতে হবে । এটাই আমাদের হানাফী মাযহাবের সিদ্ধান্ত । মালেকী এবং হাম্বলী মাযহাবের মতও এটা । তাদের দলীল হচ্ছে আয়াত ও হাদীসে চাঁদ দেখার সম্বোধন সকলের জন্য আম বা সার্বজনীন যা নামাজের ওয়াক্তের সম্বোধন থেকে আলাদা-"
(ফাতওয়া-ই-শামী, খন্ড-২, পৃঃ-১০৫) অথবা
(ফাতওয়া-ই-শামী, খন্ড-২, পৃঃ-৪৩২)

"ফিকহের প্রতিষ্ঠিত বর্ণনানুযায়ী চাঁদ ঊদয়ের বিভিন্নতা গ্রহণীয় নয় । ফতুয়াই কাযী খানের ফাতওয়াও অনুরুপ । ফকীহ আবু লাইছও এমনটাই বলেছেন । শামছুল আইম্মা হোলওয়ানী সিদ্ধান্ত দিয়েছেন যে, যদি পাশ্চাত্যবাসী রমযানের চাঁদ দেখে তবে সে দেখার দ্বারা প্রাচ্য বাসীর জন্য রোযা ওয়াজিব হবে । এমনটাই আছে খোলাছা নামক কিতাবে-"
(ফাতওয়া-ই- আলমগিরী, খন্ড-১, পৃঃ-১৯৮) অথবা
(ফাতওয়া-ই- আলমগিরী, খন্ড-৫, পৃঃ-২১৬)

চার মাযহাবের সমন্বিত ফিকহ গ্রন্থ আল ফিকহ আলা মাযাহিবিল আরবায়া নামক গ্রন্থের ভাষ্য হচ্ছে-
"পৃথিবীর কোন এক প্রান্তে চাঁদ দেখা প্রমাণিত হলে সকল স্থানেই উক্ত দেখার দ্বারা রোযা ফরয হবে । চাই চাঁদ নিকটবর্তী দেশে দেখা যাক বা দূরবর্তী দেশে দেখা যাক এতে কোন পার্থক্য নেই । তবে চাঁদ দেখার সংবাদ গ্রহণযোগ্য পদ্ধতিতে অন্যদের নিকট পৌছতে হবে । তিন ইমাম তথা ইমাম আবু হানীফা রহমাতুল্লাহি আলাইহি,ইমাম মালেক রহমাতুল্লাহি আলাইহি এবং ইমাম আহমদ ইবনু হাম্বল রহমাতুল্লাহি আলাইহি-এর মতে চাঁদের উদয়স্থলের ভিন্নতা গ্রহণীয় নয় । অর্থাৎ প্রথম দিনের দেখার দ্বারাই সর্বত্র আমল ফরয হয়ে যাবে"
(আল ফিকহ আলা মাযাহিবিল আরবায়া, খন্ড-১, পৃঃ-৪৪৩) অথবা
(আল ফিকহ আলা মাযাহিবিল আরবায়া, খন্ড-১, পৃঃ-৮৭১)

বাংলাদেশের প্রাচীন ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হাট হাজারী মাদরাসার শাইখুল হাদীস আল্লামা হাফেজ আবুল হাসান সাহেব তার রচিত মিশকাত শরীফের ব্যাখ্যা গ্রন্থ তানযীমুল আশ্তাতে। যার ভাষ্য নিম্নে উদৃত হল-

" চাঁদের উদয় স্থলের ভিন্নতা ইমাম আবু হানিফা রহমাতুল্লাহি আলাইহি-এর নিকট গ্রহণীয় নয়। শামী কিতাবে এমনটাই রয়েছে। এটাই আমাদের (হানাফীদের) রায়। মালেকী ও হাম্বলী মাযহাবের মতও এটা। অতএব, কোন স্থানে চাঁদ দেখা প্রমাণিত হলে সর্বত্রই আমল অত্যাবশ্যকীয় হবে।"
----- (তানযীমুল আশ্তাত, খন্ড-১, পৃঃ-৪১)

The co-founder of Dar al-Uloom Deoband, Maulana Rasheed Ahmad Gangohi said: "If the people of Calcutta sighted the moon in Friday, whereas it was sighted in Makkah on Thursday itself, but the people of Calcutta did not know of it (the sighting on Thursday); then whenever they come to know of this, it will be obligatory for them to celebrate eid with the people of Makkah and make up (Qada') for the first fasting." [Maulana Rasheed Ahmad Gangohi, Sharh Tirmizi (Explanation of Tirmizi), Kaukab un Durri, pg 336 Urdu edition].

"Wherever the sighting is confirmed, however far off it may be, even if it were to be thousands of miles; the people of this place will have to abide by that." [Fatawa Dar ul Uloom Deoband, Vol. 6 page 380, Urdu edition]

উপমহাদেশের অন্যতম ইসলামী শিক্ষা কেন্দ্র “দারুল উলুম দেওবন্দ”-এর গ্রান্ড মুফতি আযিযুর রহমান সাহেব ফতোয়া-ই-দারুল উলুম দেওবন্দ-এ লিখেছেন-
 "হানাফী মাযহাব মতে চাঁদের উদয় স্থলের ভিন্নতা গ্রহনীয় নয় । যদি কোন স্থানে শা’বান মাসের ২৯ তারিখে রমযানের চাঁদ দেখা যায় এবং শরয়ীভাবে তা প্রমাণিত হয় তখন ঐ হিসেবেই সকল স্থানে রোযা রাখা অপরিহার্য হয়ে যাবে । যে স্থানের লোকেরা সংবাদ পরে পাওয়ার কারণে শা’বান মাস ৩০ দিন পূর্ণ করে রোযা শুরু করেছে তারাও প্রথমদের সঙ্গে ঈদ করবে এবং প্রথমের একটি রোযা কাযা করবে"
-(ফাতওয়া-ই-দারুল উলুম দেওবন্দ, খন্ড-৬, পৃঃ-৩৯৮)

হানাফি মাযহাবের বিশ্ব বিখ্যাত ও সর্বজন বিদিত ফিকহ্ গ্রন্থ ”ফতহুল কাদির”-এর ভাষ্য হচ্ছে-
"যখন কোন শহরে চাঁদ দেখা প্রমাণিত হবে, তখন সকল মানুষের উপর রোযা রাখা ফরয হবে। ফিকহের প্রতিষ্ঠিত মাযহাব অনুযায়ী পাশ্চাত্য বাসীর চাঁদ দেখার দ্বারা প্রাচ্য বাসীর জন্য রোযা রাখা ফরয হবে।"
---- (ফতহুল কাদির, খন্ড-২, পৃঃ-৩১৮)
অথবা (ফতহুল কাদির, খন্ড-৪, পৃঃ-২১৬)

আরও দেখুন http://www.newmoonbd.com/fikhs_decision.php

বিশ্বের ৫৭টি মুসলিম দেশ এবং সকল মুসলিমের প্রতিনিধিত্বকারী বিশ্ব মুসলিম সংগঠন ও, আই, সি-এর ফিকহ একাডেমী ১৯৮৬ সনের ১১-১৬ অক্টোবর জর্ডানের রাজধানী আম্মানে অনুষ্ঠিত শীর্ষ সম্মেলনে শতাধিক শরীয়াহ্‌ বিশেষজ্ঞের সর্ব সম্মতিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন যে, “বিশ্বের কোন এক দেশে চাঁদ দেখা গেলে সকল মুসলিমকে ঐ দেখার ভিত্তিতেই আমল করতে হবে।

এখানে প্রাসংঙ্গিকতায় কিছু প্রশ্নের উদ্রেক হওয়া খুবই স্বাভাবিক। ঐ সব প্রাসংঙ্গিক প্রশ্নাবলীর জবাব নিম্নে আলোচনা করা হল-

এক:-- যদি প্রশ্ন করা হয়, পৃথিবীর সকল জায়গায় একই সঙ্গে দিন ও রাত হয়না। বরং এক স্থানে যখন রাত অন্য স্থানে তখন দিন। তাহলে কুরআন, সুন্নাহ এবং ফিকহের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী একই দিনে সমগ্র বিশ্বে রোযা, ঈদ, কুরবানী ইত্যাদি ইবাদাত পালন করা কীভাবে সম্ভব? জবাব: অত্র প্রশ্নের জবাবটি পরোপুরি ভৌগলিক জ্ঞানের সাথে সম্পৃক্ত। তাই এ প্রশ্নের জবাব জানার পূর্বে ভৌগলিক কিছু ধারণা অর্জন একান্তই দরকার। এ ক্ষেত্রে প্রথমেই জানা প্রয়োজন, প্রতি চান্দ্র মাসের নুতন চাঁদ সকল সময় পৃথিবীর কোন নির্দিষ্ট অঞ্চলে দৃষ্টি গোচর হবে? না কি বিভিন্ন মাসের চাঁদ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে দেখো যাবে?

নুতন চাঁদ পৃথিবীর কোন অঞ্চলে সর্বপ্রথম দেখা যাবে আমাদেরকে সর্বাগ্রে সে ব্যাপারে যথাযথ জ্ঞান অর্জন করতে হবে। এ বিষয়ে ভৌগলিক গবেষণার ফলাফল হলো প্রতি চান্দ্র মাসের ১ তারিখের চাঁদ সব সময়ই সর্বপ্রথম মধ্য প্রাচ্যের কোন না কোন দেশে দৃষ্টিগোচর হবে। কারণ চান্দ্র মাসের প্রথম দিনে চাঁদ এবং সূর্য প্রায় একই সময়ে পূর্ব দিগন্তে (জাপানে) উদিত হয়। এবং উদয় স্থলের পূর্ণ বিপরীত মেরুতে (দক্ষিণ-পশ্চিম আটলান্টিকে) সূর্য অস্ত যাওয়ার প্রায় ৪৯ মিনিট পরে চাঁদ অস্ত যায়। অর্থাৎ সর্ব পশ্চিম দিগন্তে প্রথম তারিখের চাঁদ সূর্য অস্ত যাওয়ার পরেও প্রায় ৪৯ মিনিট আকাশে থাকে। এ সময় সূর্যাস্তের পর দিগন্তে চাঁদের যে কিঞ্চিত অংশটুকু সূর্যের আলোয় প্রতিফলিত হয় তাকেই আমরা নুতন চাঁদ হিসেবে দেখি। প্রথম দিনের চাঁদ সূর্যের ৪৯ মিনিট পরে অস্ত যায় বলেই ২য় দিনের চাঁদ সূর্য উদয়ের ৪৯ মিনিট বিলম্বে পূর্বাকাশে উদিত হয়। কারণ আকাশের যে দিগন্ত রেখা আটলান্টিকের জন্য অস্তস্থল, আবার সে দিগন্ত রেখাই জাপানের জন্য উদয়স্থল। এভাবে প্রতি দিনই উদয়ের বিলম্বতায় ৪৯ মিনিট করে যুক্ত হতে থাকে। একারণেই ২৯ দিনে চাঁদকে ২৯টি স্থানে উদয় হতে দেখা যায়। আবার সাড়ে ২৯ দিন পরে চাঁদ ২৪ ঘন্টা ঘুরে এসে পরবর্তী চন্দ্র মাসের ১ তারিখে আবার নুতন করে সূর্যের সঙ্গে প্রায় একই সময় উদিত হয়। গবেষণালব্ধ আলোচিত তথ্যগুলোকে সঠিক প্রমাণিত করছে এ হিসেবটি।

প্রতি দিনের চাঁদ উদয়ে বিলম্ব ঘটে ৪৯ মিনিট। প্রতি চান্দ্র মাসের পরিধি হচ্ছে সাড়ে ২৯ দিন ৬০ মিনিট = ১ ঘন্টা। সুতরাং (৪৯ X ২৯১/২ দিন / ৬০ মিনিট) = ২৪ ঘন্টা। এভাবেই প্রতি সাড়ে ২৯ দিনে চাঁদ ২৪ ঘন্টা সময় অতিক্রম করে পরবর্তী চান্দ্র মাসের ১ তারিখে আবার পূর্বের স্থানে সূর্য উদয়ের সমান সময়ে উদিত হয়।

সুতরাং প্রমাণিত হলো যে, জাপান ও আটলান্টিকের মধ্যকার ১৮০ ডিগ্রী পথ অতিক্রম করতে সূর্য ও চাঁদ অস্ত যাওয়ার মধ্যে ব্যবধান হয় ৪৯ মিনিট।
ভৌগলিক ভাবে প্রমাণিত যে, গ্রীনিচমান সময়ের (GMT) দিক থেকে পৃথিবীর সর্ব প্রথম সূর্য উদয়ের দেশ জাপান। যার ভৌগলিক অবস্থান ১৪২ ডিগ্রী পূর্ব দ্রাঘিমাংশ এবং ৩৭.৫ ডিগ্রী উত্তর অক্ষাংশ। এ উদয় স্থল হিসেবে পূর্ণ বিপরীত মেরুর অস্তস্থল হল দক্ষিণ পশ্চিম আটলান্টিক মহাসাগর। যার ভৌগলিক অবস্থান ৩৮ ডিগ্রী পশ্চিম দ্রাঘিমাংশ এবং ৩৭.৫ দক্ষিণ অক্ষাংশ। এ উদয় ও অস্ত স্থলের মধ্যে সময়ের ব্যবধান ১২ ঘন্টা এবং অবস্থানগত দূরত্ব ১৮০ ডিগ্রী। কারণ প্রতি ১ ডিগ্রীতে সময়ের ব্যবধান ৪ মিনিট।

চান্দ্র মাসের ১ তারিখে চাঁদ ও সূর্য প্রায় একই সময়ে জাপানে উদিত হয়ে ১৮০ ডিগ্রী পথ অতিক্রম করে সন্ধ্যায় সূর্য যখন আটলান্টিকে অস্ত যায়, চাঁদ তার পরেও আটলান্টিকের আকাশে থাকে প্রায় ৪৯ মিনিট। ১৮০ ডিগ্রী পথ অতিক্রম করতে যদি সূর্য ও চাঁদের অস্ত যাওয়ার মধ্যে সময়ের ব্যবধান হয় ৪৯ মিনিট তাহলে এর অর্ধেক পথ অর্থাৎ ৯০ ডিগ্রী পথ অতিক্রম করতে সূর্য ও চাঁদের অস্ত যাওয়ার মধ্যে সময়ের ব্যবধান হবে সাড়ে ২৪ মিনিট। মধ্য প্রাচ্যের (ইয়েমেন, রিয়াদ ও বাগদাদ) অবস্থান ৪৫ ডিগ্রী পূর্ব দ্রাঘিমাংশে হওয়ায় উদয় স্থল জাপান ও অস্ত স্থল আটলান্টিকের সঙ্গে মধ্য প্রাচ্যের ভৌগলিক অবস্থানের ব্যবধান ৯০ ডিগ্রী। যে কারণে মধ্য প্রাচ্যে যখন সূর্যাস্ত হয় তার পরেও চান্দ্র মাসের ১ তারিখের চাঁদ মধ্য প্রাচ্যের আকাশে থাকে ২০ থেকে ২৫ মিনিট। ফলে চান্দ্র মাসের ১ তারিখের চাঁদ সকল সময়ে সর্বপ্রথম মধ্য প্রাচ্যেই দৃষ্টি গোচর হবে। এবং ক্রমান্বয়ে পশ্চিমাঞ্চলীয় দেশ সমূহে সূর্যাস্তের পরে চাঁদের স্থায়িত্ব আকাশে বেশি সময় থাকবে। যার ফলে চান্দ্র মাসের ১ তারিখে ঐ সকল পশ্চিমাঞ্চলীয় দেশে চাঁদ ক্রমান্বয়ে বেশী সময় ধরে দেখা যাবে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্য থেকে পূর্বাঞ্চলীয় দেশসমূহ ক্রমান্বয়ে উদয় স্থলের নিকটবর্তী হওয়ায় সূর্যাস্তের পরে এখানকার আকাশে ১ তারিখের চাঁদের স্থায়িত্ব কম সময় থাকে এবং চাঁদ দিগন্তে আকাশে কম উঁচুতে থাকে বলেই উদয়স্থলের নিকটবর্তী দেশ সমূহ পাকিস্তান, ভারত, বাংলাদেশ, চীন বা জাপানে কখনই চান্দ্র মাসের ১ তারিখের চাঁদ দেখা যাবে না।

উল্লেখিত আলোচনায় প্রমাণিত যে, প্রতি চান্দ্র মাসের ১ তারিখের চাঁদ সব সময় সর্বপ্রথম মধ্যপ্রাচ্যের কোন না কোন দেশে দেখা যাবে।

আর তারপরেও যদি অন্য কোথাও চাঁদ দেখা যায় অর্থাৎ বিশ্বের যেখানেই আগে চাঁদ দেখা যাক না কেন সেই অনুযায়ী সারা বিশ্ব বাসীকে একই বারে/দিনে আমল করতে হবে, যা আমরা উপরে আলোচনা করেছি।

যেহেতু প্রমাণিত যে, নুতন চাঁদ সকল সময়ই মধ্য প্রাচ্যের যে কোন দেশে সর্ব প্রথম দৃষ্টি গোচর হবে। তাই মধ্যপ্রাচ্যের স্থানীয় সময়ের সবচেয়ে বেশী অগ্রগামী সময়ের দেশ জাপানবাসীর জন্য ১ম তারিখের রোযা রাখার সম্ভাব্যতা সর্বাধিক প্রশ্ন সাপেক্ষ। কিন্তু গবেষণায় সুপ্রমাণিত যে, ঐ দিন জাপানবাসীর জন্যও রোযা রাখা সম্ভব। যেমন বছরের সবচেয়ে ছোট রাত জুলাই মাসকেও যদি আলোচনায় আনা হয় তবে দেখা যাবে, জুলাই মাসে সর্ব শেষ সূর্যাস্ত হয় ৬টা ৫৫ মিনিটে। তাহলে মধ্য প্রাচ্যে সূর্যাস্তের পর পর সন্ধ্যা ৭টায় নুতন চাঁদ দেখা গেল। ঐ সময় পৃথিবীর সর্বপূর্ব স্থান জাপানে রাত ১টা ২৮ মিনিট। কারণ মধ্যপ্রাচ্য ও জাপানের মধ্যে অবস্থানগত দূরত্ব ৯৭ ডিগ্রী পূর্ব দ্রাঘিমাংশ। ফলে স্থানীয় সময় মধ্য প্রাচ্যের স্থানীয় সময়ের চেয়ে ৬ঘন্টা ২৮মিনিট অগ্রগামী। তাহলে ফলাফল দাড়াল মধ্য প্রাচ্যে সন্ধ্যা ৭টায় চাঁদ দেখা গেলে জাপানে সে চাঁদ দেখার সংবাদ পৌঁছতেছে রাত ১টা ২৮ মিনিটে। অথচ জুলাই মাসে সাহরী খাওয়ার সর্বনিম্ন সময় হলো ৩টা ৪৩ মিনিট। তাহলে জাপানবাসী চাঁদ উদয়ে সংবাদ পাওয়ার পরেও রোযা রাখতে সাহরী খাওয়ার জন্য সময় পাচ্ছেন প্রায় ২ ঘন্টা ১৫ মিনিট। যা সাহরীর জন্য কোন বিবেচনায়-ই অপ্রতুল নয়। উপরন্ত ঐ সময়ের মধ্যে তারাবীর নামায আদায় করাও সম্ভব। আর পশ্চিমাঞ্চলীয় দেশের জন্য আমল করা কোন ভাবেই কষ্টকর নয়। কারণ যত পশ্চিমাঞ্চলীয় দেশের দিকে আসা হবে তারা চাঁদ উদয়ের সংবাদের পরে সাহরী খাওয়ার জন্য ততবেশী সময় পাবে।

দুই:-- যদি প্রশ্ন করা হয়, আমরা বাংলাদেশে যখন ইফতার করি তখন আমেরিকায় ভোর, আবার আমরা যখন সাহরী খাই তখন আমেরিকায় বিকাল, তাহলে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যে একই দিনে আমল করা কি করে সম্ভব? জবাব: অত্র পশ্নের উত্তর বুঝার জন্য দু’টি মৌলিক বিষয় গভীর ভাবে স্মরণ রাখতে হবে। এক: চাঁদের তারিখ সংশ্লিষ্ট আমলগুলো সমগ্র পৃথিবীতে একই সময়ে অনুষ্ঠিত হবেনা। বরং একই দিনে (অর্থাৎ শুক্র, শনি, রবি----------বুধ বা বৃহস্পতিবারে) এবং একই তারিখে অনুষ্ঠিত হবে। দুই: যেহেতু সব সময়েই মধ্যপ্রাচ্যের কোন না কোন দেশে সর্বপ্রথম নুতন চাঁদ দেখা যাবে তাই চাঁদের তারিখ নির্ভর সকল ইবাদাত পালনের ক্ষেত্রে পৃথিবীর যে কোন দেশের সময়ের হিসেব মধ্যপ্রাচ্যের স্থানীয় সময়ের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। বাংলাদেশ বা অন্য কোন দেশের সময়ের সঙ্গে নয়।

তাহলে মনে করা যাক, বৃহস্পতিবার দিবাগত সন্ধ্যা ৭টায় মধ্য প্রাচ্যে পবিত্র রমযানের চাঁদ দেখা গেল এবং প্রমাণিত হল শুক্রবার ১ রমযান। এখন সমগ্র বিশ্বে ১ রমযান হিসেবে শুক্রবারে রোযা রাখা যায় কিনা এটাই মূল বিবেচনার বিষয়। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৭টায় যখন মধ্য প্রাচ্যে চাঁদ দেখা গেল তখন ঐ চাঁদ দেখার সংবাদ ১৪২ডিগ্রী পূর্ব দ্রাঘিমাংশে অবস্থিত সর্বপ্রথম সূর্যোদয়ের দেশ জাপানে পৌঁছবে জাপানের স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১টা ২৮মিনিটে। অথচ সাহরীর সর্বশেষ সময় সীমা কখনই ৩টা ৪৩মিনিটের নিম্নে আসেনা। তাহলে জাপানবাসী বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে চাঁদ উদয়ের সংবাদ শুনে শুক্রবারে রোযা রাখার জন্য সাহরী খেতে সময় পাচ্ছেন (৩:৪৩মিঃ - ১:২৮মিঃ) ২ঘন্টা ১৫মিনিট। এমনিভাবে ১২০ডিগ্রী পূর্ব দ্রাঘিমাংশে অবস্থিত দেশ ইন্দোনেশিয়ার সুমবা, ফ্লোরেস, ফিলিপাইন, তাইওয়ান, চীনের শেংইয়াং, হাইলার, ইনহো, রাশিয়ার টালুমা, খরিনটস্কি, সুখানা এবং অলিনেক অঞ্চলে চাঁদ দেখার সংবাদ পৌঁছবে বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১২টায়। ফলে বছরের সব চেয়ে ছোট রাতেও চাঁদ উদয়ের সংবাদ পাবার পরে শুক্রবার ১ রমযানের রোযা রাখতে সাহরী খাওয়ার জন্যে তারা সময় পাবে ৩ ঘন্টা ৪৩ মিনিট। অতএব তাদের জন্যে শুক্রবার রোযা রাখা সম্ভব। এরপরে ১০৫ডিগ্রী পূর্ব দ্রাঘিমাংশে অবস্থিত দেশ তেলাকবেটং, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, লাওস, চীনের ইপিং, চেংটু, মোঙ্গলিয়া এবং রাশিয়ার মধ্য সাইবেরিয়ান অঞ্চলে চাঁদ দেখার সংবাদ পৌঁছবে বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১১টায়। ফলে তারাবীহ ও সাহরীর জন্যে তারা সময় পাবে ৪ ঘন্টা ৪৩ মিনিট। তারপরে ৯০ডিগ্রী পূর্ব দ্রাঘিমাংশে অবস্থিত দেশ বাংলাদেশ, ভুটান, চীনের লাসা, টুরপান, ফাইয়ুন, রাশিয়ার আবাজা অচিনিস্ক, নগিনস্কি অঞ্চলে চাঁদ দেখার সংবাদ পৌঁছবে বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১০টায়। ফলে তারাবীহ ও সাহরীর জন্যে তারা সময় পাবে ৫ ঘন্টা ৪৩ মিনিট এভাবে ৭৫ডিগ্রী পূর্ব দ্রাঘিমায় অবস্থিত দেশ ভারতের দিল্লী, কাশ্মীর, কিরগিজিয়া, পূর্বপাকিস্তানে চাঁদ দেখার সংবাদ পৌঁছবে ঐরাত ৯টায় এবং ৬০ডিগ্রী পূর্ব দ্রাঘিমায় অবস্থিত দেশ পাকিস্তানের করাচী, আফগানিস্তান, পূর্ব ইরান, তুর্কমেনিস্তান, উজবেকিস্তানে চাঁদ দেখার সংবাদ পৌঁছবে ওখানকার স্থানীয় সময় রাত ৮টায়। তাহলে প্রমাণিত হল মধ্যপ্রাচ্য থেকে শুরু করে জাপান পর্যন্ত পূর্ব গোলার্ধের সকল দেশে শুক্রবার ১ রমযানের রোযা রাখা সম্পূর্ণ সম্ভব।

এবার পশ্চিমাঞ্চলীয় দেশ নিয়ে আলোচনা করা যাক। ৪৫ডিগ্রী পূর্ব দ্রাঘিমাংশে অবস্থিত মধ্যপ্রাচ্যে যখন বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৭টায় রমযানের চাঁদ দেখা গেল তখন ৩০ডিগ্রী পূর্ব দ্রাঘিমাংশে অবস্থিত দেশ দক্ষিন আফ্রিকার ডারবান, জিম্বাবুই, জাম্বিয়ার বেলা, তানজানিয়ার বরুনডি, সুদান, মিসর, তুরস্কের বুরসা, ইউক্রেন এবং রাশিয়ার লেলিন গ্রাদ ইত্যাদি অঞ্চলে উক্ত চাঁদ দেখার সংবাদ পৌঁছবে ঐ অঞ্চল সমূহের স্থানীয় সময় বিকাল ৬টায়। ফলে চাঁদ উদয়ের সংবাদ পাবার পরে শুক্রবার ১ রমযানের রোযা রাখতে তারা সময় পাবেন ৯ ঘন্টা ৪৩ মিনিট। এমনি ভাবে ১৫ডিগ্রী পূর্ব দ্রাঘিমাংশে অবস্থিত দেশ সমূহে চাঁদ দেখার সংবাদ পৌঁছবে বৃহস্পতিবার বিকাল ৫টায়। ০ডিগ্রী পূর্ব দ্রাঘিমাংশে অবস্থিত দেশ টগো, মালি, আলজেরিয়ার রেগান, ওরান, স্পেনের ভ্যালেনসিয়া, ফ্রান্সের বদৌস ও প্যারিস এবং লন্ডন অঞ্চল সমূহে চাঁদ দেখার সংবাদ পৌঁছবে বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টায়। আরো পশ্চিমে ১৫ডিগ্রী পশ্চিম দ্রাঘিমাংশে অবস্থিত দেশ সেনেগাল, মৌরতানিয়ার নৌয়াকচট, পশ্চিম সাহারা, পূর্ব আইসল্যান্ড ইত্যাদি অঞ্চলে চাঁদ দেখার সংবাদ পৌঁছবে বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টায়। এমনি করে ৩০ডিগ্রী পশ্চিম দ্রাঘিমায় দুপুর ২টায়, ৪৫ডিগ্রী পশ্চিম দ্রাঘিমায় দুপুর ১টায়, ৬০ডিগ্রী পশ্চিম দ্রাঘিমাংশে পূর্ব আর্জেটিনায়, প্যারাগুয়ে, মধ্য ব্রাজিলে, পূর্ব ভেনিজুয়েলায়, পূর্ব কানাডায় এবং পশ্চিম গ্রীনল্যান্ডে চাঁদ দেখার সংবাদ পৌঁছবে বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টায়। এমনি করে ৭৫ডিগ্রী পশ্চিম দ্রাঘিমায় সংবাদ পৌঁছবে বেলা ১১টায়। ৯০ডিগ্রী পশ্চিম দ্রাঘিমায় সংবাদ পৌঁছবে বেলা ১০টায়। ১০৫ডিগ্রী পশ্চিম দ্রাঘিমার দেশ সমূহ মেক্সিকো, যুক্তরাষ্ট্রের আলবুক্‌য়ার্ক, ডেনভার, সিয়েন, মাইলস্‌ সিটি এবং মধ্য কানাডীয় অঞ্চলে চাঁদ দেখার সংবাদ পৌঁছবে এসব অঞ্চলের স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার সকাল ৯টায়। এমনি ভাবে সর্বশেষ ১৮০ডিগ্রী পশ্চিম দ্রাঘিমার দেশ যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জ, আলিউটিয়ান দ্বীপপুঞ্জে চাঁদ দেখার সংবাদ পৌঁছবে সেখানের স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার ভোর ৪টায়। এবং উল্লেখিত সকল দ্রাঘিমায় অবস্থিত দেশ সমূহের অধিবাসীরা জানবে যে, মধ্য প্রাচ্যে বৃহস্পতিবার দিবাগত সন্ধ্যা ৭টায় নুতন চাঁদ দেখার কারণে ১ রমযান হচ্ছে শুক্রবার। অতএব মধ্যপ্রাচ্য থেকে পশ্চিম দ্রাঘিমার দেশগুলো যথাক্রমে বৃহস্পতিবার দিনের অংশ ও পূর্ণদিন অতিক্রমের পরে স্থানীয় ভাবে যে দেশে যখন শুক্রবার শুরু হবে সে দেশে তখন শুক্রবারে ১ রমজানের রোযা পালন করবে।
২য় অংশ
উল্লেখিত আলোচনার সারকথা হলো শুক্রবার দিবসটি জাপানে শুরু হবে মধ্যে প্রাচ্যের ৬ঘন্টা ২৮মিনিট পূর্বে এবং পশ্চিম যুক্তরাষ্ট্রে শুরু হবে মধ্য প্রাচ্যের স্থানীয় সময়ের ১৫ঘন্টা পরে। কিন্তু দিন একটিই তাহল শুক্রবার। তবে উভয় স্থানে দিন ও তারিখ হবে অভিন্ন। অতএব জাপানে শুক্রবারের রোযা শুরু হবে পশ্চিম যুক্তরাষ্ট্রের ২৩ঘন্টা পূর্বে। আবার পশ্চিম যুক্তরাষ্ট্রে রোযা শুরু হবে জাপানের স্থানীয় সময়ের ২৩ঘন্টা পরে। যেমন আমাদের বাংলাদেশে আমরা রোযা রাখলাম শুক্রবার। কিন্তু পাবর্ত্য চট্টগ্রামে সাহরীর শেষ সময় যদি হয় ৪টা ৩০মিনিট, তবে রাজশাহীতে সাহরীর শেষ সময় হবে আরো ১৩ মিনিট পরে অর্থাৎ ৪টা ৫৩ মিনিট। তাহলে বাংলাদেশে শুক্রবারের রোযা পার্বত্য চট্টগ্রামে শুরু হল ১৩ মিনিট পূর্বে এবং রাজশাহীতে শুরু হল ১৩ মিনিট পরে। ঠিক তেমনি সমগ্র পৃথিবীতে রোযা শুরু ও শেষ হওয়ার সময় স্থানীয় সময় অনুপাতে আগ-পিছ হলেও দিন ও তারিখ হবে অভিন্ন। অতএব সমগ্র পৃথিবীতে অভিন্ন দিন ও তারিখে রোযা রাখা সম্পূর্ণ সম্ভব।

ঠিক একই ভাবে, মনে করা যাক, বৃহস্পতিবার দিবাগত সন্ধ্যা ৭টায় মধ্য প্রাচ্যে পবিত্র ঈদের চাঁদ দেখা গেল এবং প্রমাণিত হল শুক্রবার ঈদ। এখন সমগ্র বিশ্বে ১ লা শাওয়াল হিসেবে শুক্রবারে ঈদ করা যায় কিনা এটাই মূল বিবেচনার বিষয়।

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৭টায় যখন মধ্য প্রাচ্যে চাঁদ দেখা গেল তখন ঐ চাঁদ দেখার সংবাদ ১৪২ডিগ্রী পূর্ব দ্রাঘিমাংশে অবস্থিত সর্বপ্রথম সূর্যোদয়ের দেশ জাপানে পৌঁছবে জাপানের স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১টা ২৮মিনিটে। তাহলে জাপানবাসী বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে চাঁদ উদয়ের সংবাদ শুনে শুক্রবারে ঈদ করবে।

এমনিভাবে ১২০ডিগ্রী পূর্ব দ্রাঘিমাংশে অবস্থিত দেশ ইন্দোনেশিয়ার সুমবা, ফ্লোরেস, ফিলিপাইন, তাইওয়ান, চীনের শেংইয়াং, হাইলার, ইনহো, রাশিয়ার টালুমা, খরিনটস্কি, সুখানা এবং অলিনেক অঞ্চলে চাঁদ দেখার সংবাদ পৌঁছবে বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১২টায়। ফলে বছরের সব চেয়ে ছোট রাতেও চাঁদ উদয়ের সংবাদ পাবার পরে শুক্রবার ঈদ করতে পারবে। অতএব তাদের জন্যে শুক্রবার ঈদ করা সম্ভব। এরপরে ১০৫ডিগ্রী পূর্ব দ্রাঘিমাংশে অবস্থিত দেশ তেলাকবেটং, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, লাওস, চীনের ইপিং, চেংটু, মোঙ্গলিয়া এবং রাশিয়ার মধ্য সাইবেরিয়ান অঞ্চলে চাঁদ দেখার সংবাদ পৌঁছবে বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১১টায়। তারপরে ৯০ডিগ্রী পূর্ব দ্রাঘিমাংশে অবস্থিত দেশ বাংলাদেশ, ভুটান, চীনের লাসা, টুরপান, ফাইয়ুন, রাশিয়ার আবাজা অচিনিস্ক, নগিনস্কি অঞ্চলে চাঁদ দেখার সংবাদ পৌঁছবে বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১০টায়। এভাবে ৭৫ডিগ্রী পূর্ব দ্রাঘিমায় অবস্থিত দেশ ভারতের দিল্লী, কাশ্মীর, কিরগিজিয়া, পূর্বপাকিস্তানে চাঁদ দেখার সংবাদ পৌঁছবে ঐরাত ৯টায় এবং ৬০ডিগ্রী পূর্ব দ্রাঘিমায় অবস্থিত দেশ পাকিস্তানের করাচী, আফগানিস্তান, পূর্ব ইরান, তুর্কমেনিস্তান, উজবেকিস্তানে চাঁদ দেখার সংবাদ পৌঁছবে ওখানকার স্থানীয় সময় রাত ৮টায়। তাহলে প্রমাণিত হল মধ্যপ্রাচ্য থেকে শুরু করে জাপান পর্যন্ত পূর্ব গোলার্ধের সকল দেশে শুক্রবার ১ লা শাওয়াল ঈদ করা সম্পূর্ণ সম্ভব।

এবার পশ্চিমাঞ্চলীয় দেশ নিয়ে আলোচনা করা যাক। ৪৫ডিগ্রী পূর্ব দ্রাঘিমাংশে অবস্থিত মধ্যপ্রাচ্যে যখন বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৭টায় ঈদের চাঁদ দেখা গেল তখন ৩০ডিগ্রী পূর্ব দ্রাঘিমাংশে অবস্থিত দেশ দক্ষিন আফ্রিকার ডারবান, জিম্বাবুই, জাম্বিয়ার বেলা, তানজানিয়ার বরুনডি, সুদান, মিসর, তুরস্কের বুরসা, ইউক্রেন এবং রাশিয়ার লেলিন গ্রাদ ইত্যাদি অঞ্চলে উক্ত চাঁদ দেখার সংবাদ পৌঁছবে ঐ অঞ্চল সমূহের স্থানীয় সময় বিকাল ৬টায়। ফলে চাঁদ উদয়ের সংবাদ পাবার পরে শুক্রবার ১ লা শাওয়াল ঈদ করবেন । এমনি ভাবে ১৫ডিগ্রী পূর্ব দ্রাঘিমাংশে অবস্থিত দেশ সমূহে চাঁদ দেখার সংবাদ পৌঁছবে বৃহস্পতিবার বিকাল ৫টায়। ০ডিগ্রী পূর্ব দ্রাঘিমাংশে অবস্থিত দেশ টগো, মালি, আলজেরিয়ার রেগান, ওরান, স্পেনের ভ্যালেনসিয়া, ফ্রান্সের বদৌস ও প্যারিস এবং লন্ডন অঞ্চল সমূহে চাঁদ দেখার সংবাদ পৌঁছবে বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টায়। আরো পশ্চিমে ১৫ডিগ্রী পশ্চিম দ্রাঘিমাংশে অবস্থিত দেশ সেনেগাল, মৌরতানিয়ার নৌয়াকচট, পশ্চিম সাহারা, পূর্ব আইসল্যান্ড ইত্যাদি অঞ্চলে চাঁদ দেখার সংবাদ পৌঁছবে বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টায়। এমনি করে ৩০ডিগ্রী পশ্চিম দ্রাঘিমায় দুপুর ২টায়, ৪৫ডিগ্রী পশ্চিম দ্রাঘিমায় দুপুর ১টায়, ৬০ডিগ্রী পশ্চিম দ্রাঘিমাংশে পূর্ব আর্জেটিনায়, প্যারাগুয়ে, মধ্য ব্রাজিলে, পূর্ব ভেনিজুয়েলায়, পূর্ব কানাডায় এবং পশ্চিম গ্রীনল্যান্ডে চাঁদ দেখার সংবাদ পৌঁছবে বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টায়। এমনি করে ৭৫ডিগ্রী পশ্চিম দ্রাঘিমায় সংবাদ পৌঁছবে বেলা ১১টায়। ৯০ডিগ্রী পশ্চিম দ্রাঘিমায় সংবাদ পৌঁছবে বেলা ১০টায়। ১০৫ডিগ্রী পশ্চিম দ্রাঘিমার দেশ সমূহ মেক্সিকো, যুক্তরাষ্ট্রের আলবুক্‌য়ার্ক, ডেনভার, সিয়েন, মাইলস্‌ সিটি এবং মধ্য কানাডীয় অঞ্চলে চাঁদ দেখার সংবাদ পৌঁছবে এসব অঞ্চলের স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার সকাল ৯টায়। এমনি ভাবে সর্বশেষ ১৮০ডিগ্রী পশ্চিম দ্রাঘিমার দেশ যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জ, আলিউটিয়ান দ্বীপপুঞ্জে চাঁদ দেখার সংবাদ পৌঁছবে সেখানের স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার ভোর ৪টায়। এবং উল্লেখিত সকল দ্রাঘিমায় অবস্থিত দেশ সমূহের অধিবাসীরা জানবে যে, মধ্য প্রাচ্যে বৃহস্পতিবার দিবাগত সন্ধ্যা ৭টায় নুতন চাঁদ দেখার কারণে ১ লা শাওয়াল ঈদ হচ্ছে শুক্রবার।

অতএব মধ্যপ্রাচ্য থেকে পশ্চিম দ্রাঘিমার দেশগুলো যথাক্রমে বৃহস্পতিবার দিনের অংশ ও পূর্ণদিন অতিক্রমের পরে স্থানীয় ভাবে যে দেশে যখন শুক্রবার শুরু হবে সে দেশে তখন শুক্রবারে ১ লা শাওয়াল ঈদ পালন করবে। উল্লেখিত আলোচনার সারকথা হলো শুক্রবার দিবসটি জাপানে শুরু হবে মধ্যে প্রাচ্যের ৬ঘন্টা ২৮মিনিট পূর্বে এবং পশ্চিম যুক্তরাষ্ট্রে শুরু হবে মধ্য প্রাচ্যের স্থানীয় সময়ের ১৫ঘন্টা পরে। কিন্তু দিন একটিই তাহল শুক্রবার। তবে উভয় স্থানে দিন ও তারিখ হবে অভিন্ন। অতএব জাপানে শুক্রবারের ঈদ শুরু হবে পশ্চিম যুক্তরাষ্ট্রের ২৩ঘন্টা পূর্বে। আবার পশ্চিম যুক্তরাষ্ট্রে ঈদ শুরু হবে জাপানের স্থানীয় সময়ের ২৩ঘন্টা পরে। সমগ্র পৃথিবীতে ঈদ শুরু ও শেষ হওয়ার সময় স্থানীয় সময় অনুপাতে আগ-পিছ হলেও দিন ও তারিখ হবে অভিন্ন। অতএব সমগ্র পৃথিবীতে অভিন্ন দিন ও তারিখে ঈদ করা সম্পূর্ণ সম্ভব।

যারা নিজ নিজ দেশের চাঁদ অনুযায়ী রোজা ও ঈদ পালন করে থাকেন তাদের দলীল ও তাঁর জবাব

  বর্তমানে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানে সমাজে প্রচলিত এলাকা ভিত্তিক আমলকে প্রতিষ্ঠিত রাখার জন্য কিছু সংখ্যক ওলামায়ে কিরাম হাদিসে কুরাইব (রাঃ) নামে প্রসিদ্ধ একটি হাদীসকে দলীল পেশ করেন। উক্ত হাদিসটি নিম্নরূপঃ

মুসলিম শরীফের এক বর্ণনা থেকে; এতে বর্ণিত আছে: "উম্মুল ফাযল বিনতুল হারিছ তাকে (কুরাইব) আশ-শামে মুয়াবিয়ার কাছে প্রেরণ করলেন; তিনি বলেন: আমি আশ-শামে গেলাম এবং তার (উম্মুল ফাযল বিনতুল হারিছ)-এর পক্ষ থেকে ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড সম্পাদন করলাম। আশ-শামে তখন রমযান মাস শুরু হয়ে গিয়েছিল। সেখানে আমি শুক্রবারেই রমযানের নতুন চাঁদ দেখেছিলাম। মাসের শেষদিকে আমি তখন মদিনায় ফিরে এলাম, আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) আমকে রমযানের নতুন চাঁদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলেন: "তুমি এটা কখন দেখেছ? আমি বললাম: শুক্রবার রাতে আমরা এটা দেখেছি। তিনি বললেন: তুমি কি এটা নিজে দেখেছ? আমি বললাম: হ্যাঁ, আমি দেখেছি এবং অন্যান্য লোকজনও দেখেছে এবং সিয়াম পালন করেছে, মুয়াবিয়া (রা) ও সিয়াম পালন করেছেন; একথা শুনে তিনি বললেন: কিন্তু আমরা এটা দেখেছি শনিবার রাতে। অতএব আমাদেরকে ত্রিশ পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত অথবা এটি শাওয়্যালের (নতুন চাঁদ) না দেখা পর্যন্ত সিয়াম পালন অব্যাহত রাখতে হবে। আমি বললাম: মুয়াবিয়ার চাঁদ দেখা কি আপনার জন্য যথেষ্ট না? তিনি বললেন: না, কারণ এভাবেই আল্লাহর রাসূল আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন।"

পবিত্র হাদীসটির জবাব

সুবিজ্ঞ মুহাদ্দেসীনে কিরাম এবং হানাফী, হাম্বলী ও মালেকী মাযহাবের ইমামগণ অত্র হাদিসে পাককে দলীল হিসেবে গ্রহণ না করে হাদিসটির নিম্নরূপ জবাব দান করেছেন-

১। অত্র ফাতওয়ার  “রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম-এর নিজ আমল” শিরোনামে পবিত্র মিশকাত শরীফের ১২৭ ও ১৭৪ পৃষ্ঠা থেকে যে তিনটি হাদীস উল্লেখ করা হয়েছে তার দ্বারা প্রমাণিত যে, রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম একজন মরুচারীর সংবাদকে ভিত্তি করে নিজে রোযা রেখেছেন এবং অন্যদেরকে রোযা রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। দূরদূরান্ত থেকে আগত একটি কাফেলার সংবাদের ভিত্তিতে ৩০শে রমযান মনে করে রাখা রোযা নিজে ভঙ্গ করেছেন এবং অন্যদেরকেও ভাঙ্গার নির্দেশ দিয়েছেন।
তাহলে যেখানে শরীয়ত প্রবর্তক নিজেই অন্যের সংবাদ গ্রহণ করে রোযা রেখেছেন এবং ঈদ করেছেন। সেখানে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস রদি আল্লাহু তায়ালা আনহু কুরাইব রদি আল্লাহু তায়ালা আনহু-এর সংবাদ গ্রহণ করলেন, কি করলেন না তা কোন যুক্তিতেই দলীল হতে পারেনা।

২। রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র আমল বিষয়ক উক্ত হাদীস তিনটি হাদিসে মারফু। (মহানবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কথা ও কাজ), আর কুরাইব রদি আল্লাহু তায়ালা আনহু-এর হাদীস হচ্ছে হাদিসে মাওকুফ। (সাহাবীগণের কথা ও কাজ) অতএব অছুলে হাদীস বা হাদীস ব্যাখ্যার মূলনীতি অনুযায়ী হাদিসে মারফুর মোকাবিলায় হাদিসে মাওকুফ কখনও দলীল হতে পারেনা।

৩। হাদিসে কুরাইব (রাঃ)-এর মধ্যে هكذا امرنا النبى صلى الله عليه وسلم এবং فلانزال نصوم حتى نكمل ثلثين اونراه বিশেষ উক্তি দু’টি মহানবী সল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম-এর নয় বরং অত্র উক্তিদ্বয় হযরত আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস রদি আল্লাহু তায়ালা আনহু-এর নিজস্ব উক্তি। তাই কোন সাহাবীর নিজস্ব উক্তি কখনই কুরআনের সুস্পষ্ট আয়াত এবং মহানবী সল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম-এর নির্দেশ ও আমলের বিপরীতে দলীল হতে পারেনা।

৪। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস রদি আল্লাহু তায়ালা আনহু তার উক্তিদ্বয় দ্বারা মূলত ইঙ্গিত করেছেন রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম-এর বাণী-    لاتصوم حتى تروه ولاتفطرو حتى تروه  এবং صوموا لرؤيته وافطروا لرؤيته এর দিকে। আর রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম-এর এ বাণীর আমল উম্মতগণ কিভাবে করবেন তা মহানবী সল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম নিজ জীবদ্ধশায়ই আমল করে দেখিয়ে গেছেন। তাহলো সকলকে চাঁদ দেখতে হবে না বরং কিছু সংখ্যকের দেখাই অন্যদের দেখার স্থলাভিষিক্ত হবে। অতএব ইবনু আব্বাস রদি আল্লাহু তায়ালা আনহু-এর উক্ত উক্তিদ্বয় দ্বারা নিজ নিজ এলাকায় চাঁদ দেখে আমল করতে হবে এ ব্যাখ্যা ঠিক নয়।

৫। ছহীহ মুসলিম শরীফের বর্ণনায় কুরাইব রদি আল্লাহু তায়ালা আনহু-এর চাঁদ দেখার স্বীকৃতি মূলক শব্দ نعم رأيته “হ্যা আমি চাঁদ দেখেছি” কথাটির উল্লেখ থাকলেও তিরমীযী সহ অন্যান্য বর্ণনায় কুরাইব (রাঃ) নিজে চাঁদ দেখেছেন এরকম শব্দের উল্লেখ নেই। ফলে অত্র হাদিসটি مضطرب বা মূল ভাষ্য কম-বেশী হওয়ায় স্পষ্ট মারফু হাদিসের বিপরীতে কখনই দলীল হতে পারেনা।

৬। আল্লামা শাওকানী (রঃ) তার লিখিত “নাইলুল আওতার” গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, হযরত কুরাইব রাদি আল্লাহু তায়ালা আনহু-এর সংবাদ এবং শামবাসীর চাঁদ দেখাকে গ্রহণ না করা এটা আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস রদি আল্লাহু তায়ালা আনহু-এর নিজস্ব ইজতিহাদ। যা সার্বজনীন আইন হিসেবে প্রযোজ্য নয়।

৭।আল্লামা ইবনু হুমাম (রঃ) ফতহুল কাদীরে এবং আল্লামা ইবনু নাজীম (রঃ) বাহরুর রায়েক-এর মধ্যে উল্লেখ করেছেন যে, পরিষ্কার আকাশে পবিত্র রমযানের চাঁদ দেখা প্রমাণিত হওয়ার জন্য শরয়ী পদ্ধতি হচ্ছে ৪টি। একঃ দু’জন আকেল, বালেগ ও স্বাধীন মুসলিম সাক্ষ্য দিবে, দুইঃ উক্ত গুণে গুণান্বিত দু’জন, অনুরূপ দু’জনের চাঁদ দেখার প্রতি সাক্ষ্য দিবে। তিনঃ অনুরূপ গুণে গুণান্বিত দু’ ব্যক্তি চাঁদ দেখায় কাজীর ফয়সালার প্রতি সাক্ষ্য দিবে। চারঃ চাঁদ দেখার খবর মানুষের মধ্যে ব্যাপক প্রচার পেয়ে দৃঢ়তার পর্যায়ে এমন ভাবে পৌঁছে যাবে যাকে মিথ্যা বলে ধারণা করা যায়না।

কিন্তু শামবাসীর চাঁদ দেখার সংবাদ কুরাইব রদি আল্লাহু তায়ালা আনহু কর্তৃক অত্র চার পদ্ধতির কোন পদ্ধতিতেই ইবনু আব্বাস রদি আল্লাহু তায়ালা আনহু-এর নিকট উপস্থাপিত হয়নি। তাই শরয়ী বিচারে তিনি উক্ত সংবাদ গ্রহণ করেননি।

৮। আল্লামা ইবনু ক্বুদামাহ্‌ (রঃ) তার মুগণী কিতাবে এবং শাইখুল হিন্দ হোসাইন আহমদ মাদানী মায়ারিফুল মাদানিয়া-এর মধ্যে উল্লেখ করেছেন যে, যদিও ইবনু আব্বাস রদি আল্লাহু তায়ালা আনহু-এর সাথে কুরাইব রদি আল্লাহু তায়ালা আনহু-এর আলোচনা হয়েছিল রমজানের চাঁদ দেখা নিয়ে কিন্তু এর প্রত্যক্ষ প্রতিক্রিয়া পড়ছিল অত্যাসন্ন ঈদুল ফিতরের উপর। কারণ উক্ত হাদিসে উল্লেখ করা হয়েছে যে, কুরাইব রাদি আল্লাহু তায়ালা আনহু রমযানের শেষের দিকে শাম থেকে মাদিনায় এসে ছিলেন। আর শরীয়তের সিদ্ধান্ত মোতাবেক কমপক্ষে দু’জনের সাক্ষী ছাড়া রোযা ছেড়ে ঈদ করা যায়না। তাই ইবনু আব্বাস রদি আল্লাহু তায়ালা আনহু একজনের সাক্ষ্য গ্রহণ না করে বলেছিলেন- هكذا امرنا النبى صلى الله عليه وسلم এবং  فلانزال -نصوم حتى نكمل ثلثين اونرا
----- (দেখুনঃ তানযীমুল আশতাত, খন্ড-২, পৃঃ-৪১, মিফতাহুন্নাজ্জাহ, খন্ড-১, পৃঃ-৪৩২,মায়ারিফুল মাদানিয়া, খন্ড-৩, পৃঃ-৩২-৩৫)

৯। হযরত ইবনু আব্বাস রদি আল্লাহু তায়ালা আনহু-এর আমলকে দলীল গ্রহণ করে, যে সকল পূর্ববর্তী আলেমগণ এলাকা ভিত্তিক আমলের সপক্ষে মতামত দিয়েছেন তারা প্রায় সকলেই একথা বলেছেন যে, নিকটবর্তী দেশ বা অঞ্চলে চাঁদের উদয় স্থলের ভিন্নতা গ্রহণীয় হবে না। এক স্থানের দেখা দ্বারাই সকল স্থানে আমল করতে হবে। আর যদি চাঁদ দেখার দেশটি চাঁদ না দেখার দেশ থেকে অনেক দূরে হয় তাহলে সে ক্ষেত্রে যার যার দেখা অনুযায়ী আমল করতে হবে। একটু গভীর ভাবে লক্ষ্য করলে সকলের নিকটই একথা সূর্যালোকের মত পরিষ্কার যে, এক দেশের চাঁদ দেখার সংবাদ অন্য দেশ থেকে গ্রহণ করা না করার দিক থেকে ঐ সকল সম্মানিত ওলামাই কিরাম পৃথিবীকে নিকটবর্তী ও দূরবর্তী এ দু’ভাগে ভাগ করার কারণ হচ্ছে যোগাযোগ ব্যবস্থার সমস্যা। তাদের যুগে যোগাযোগ ব্যবস্থার অপ্রতুলতার কারণে তাদের এ মতামত ঐ যুগের জন্য যুক্তিযুক্ত এবং যথার্থ ছিল। কিন্তু পূর্ববর্তী সম্মানিত ওলামাই কিরামের ঐ মতামত বর্তমানে দু’টি, কারণে গ্রহণ যোগ্য নয়।   এক: যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির কারণে বর্তমান পৃথিবীর বিপরীত মেরুর দেশ দু’টিও তাদের যুগের পাশাপাশি অবস্থিত দু’টি জেলা শহরের চেয়েও অধিক নিকটবর্তী। সুতরাং আজকের যোগাযোগ ব্যবস্থায় দূরবর্তী দেশ বলতে আর কোন কথা নেই। দুই: তারা যে ওজর বা বাধ্যবাধকতার কারণে এ মতামত দিয়েছেন আজকের বিশ্ব ব্যবস্থায় সে ওজর সম্পূর্ণ অনুপস্থিত।

১০। চার মাযহাবের সুবিজ্ঞ ইমামগণের প্রত্যেকেই হাদীস শাস্ত্রে গভীর পান্ডিত্যের অধিকারী ছিলেন। অতএব কুরাইব রদি আল্লাহু তায়ালা আনহু-এর বর্ণিত হাদীস তাদের জানা ছিলনা এমনটা ভাবা যায়না। তাই তারা জেনে বুঝেই রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম-এর আমলমূলক হাদীসের উপর ফাতওয়া দিয়েছেন যা সার্বজনীন আইন হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে। আর তারা কুরাইব রদি আল্লাহু তায়ালা আনহু-এর হাদীসকে একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে গণ্যকরে পবিত্র কুরআন, হাদীস এবং রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম-এর নিজ আমলের ভিত্তিতে ফাতওয়া দিয়েছেন যে, “চাঁদের উদয় স্থলের ভিন্নতা মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। বরং পৃথিবীর যে কোন স্থানে প্রথম চাঁদ দেখার ভিত্তিতে সমগ্র পৃথিবীতে এক কেন্দ্রিক তারিখ গণনা করতে হবে এবং একই দিনে সকলের উপর আমল করা জরুরী হবে।”

প্রসংগত উল্লেখ্য যে, ইমাম যায়লায়ী (রহঃ) ৬ষ্ঠ স্তরের ফকীহ। তাই তিনি মুজতাহিদ ফিদ্‌ দ্বীন নন বরং একজন মুকাল্লিদ। অতএব একজন মুকাল্লিদ হিসেবে নিজ ইমামের সিদ্ধান্তের অনুসরণই তার জন্য যুক্তিযুক্ত। তিনি নিজেই وهو قول اكثر المشائخ বলে স্বীকার করেছেন যে বেশীর ভাগ ফকীহ উক্তমত গ্রহণ করেছেন। কিন্তু তার সমসাময়ীক সময়ে যোগাযোগ ব্যবস্থার অপ্রতুলতার কারণে চাঁদ উদয়ের সংবাদ দেয়া-নেয়ার সমস্যার সমাধান কল্পেই তিনি নিকটবর্তী দেশ এবং দূরবর্তী দেশ অনুসরণের ফাতওয়া দিয়েছিলেন। বর্তমানে যোগাযোগ ব্যবস্থার কোন অসুবিধা না থাকায় সম্মানিত ইমামগণের কুরআন-সুন্নাহ ভিত্তিক মূল সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমলের কোন বিকল্প নেই।

১১। যদি সমস্ত বাহাছ তর্ক পরিহার করে হাদিসে কুরাইব-এর ভিত্তিতে ভিন্ন ভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন দিনে রোযা ও ঈদ মেনে নেওয়া হয় এবং কুরআন, সুন্নাহ ও ফিকহের উল্লেখিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রোযা, ঈদ, কুরবানীসহ চাঁদের তারিখ সংশ্লিষ্ট ইবাদাত সমূহ সমগ্র বিশ্বে একই দিনে অনুষ্ঠিত না হয় তাহলে বর্তমান প্রেক্ষাপটে এমন সব জটিল সমস্যার সৃষ্টি হবে যার কোন সমাধান নেই। নিম্নে এরকম প্রধান প্রধান কিছু সমস্যা তুলে ধরা হল-

এক: বাংলাদেশে বর্তমান প্রচলিত আমলের কারণে পবিত্র রমযানের প্রথম দিকের এক বা দুই দিনের রোযা আমরা কখনই পাইনা। কারণ মাসয়ালা মতে আমাদের এক বা দু’দিন পূর্বেই পবিত্র রমযান মাস শুরু হয়ে যায়। এটা জেনেও আমরা ঐ এক বা দু’দিন ফরয রোযা রাখিনা।

দুই: মাসয়ালা অনুযায়ী সমগ্র পৃথিবীতে যেদিন পহেলা শাওয়াল হিসেবে ঈদ পালন হয় আমরা সেদিন ২৯ বা ৩০ রমযান হিসেবে রোযা রাখি। অথচ সর্ব সম্মত মতে ঈদের দিনে রোযা রাখা হারাম। জেনে শুনে ঐ দিন রোযা রাখা জায়েজ মনে করলে ইসলামী শরীয়াহ অনুযায়ী ঐ ব্যক্তির ঈমান চলে যাবে। কারণ সে হারামকে হালাল মনে করে কার্য সম্পাদন করেছে।

তিন: বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থায় প্রতিদিনই এক দেশ থেকে অন্য দেশে বহু লোক যাতায়াত করছে। এ ধারাবাহিকতায় মধ্য প্রাচ্যসহ পৃথিবীর অন্যান্য দেশে রোযা শুরু করে বাংলাদেশে এসে ঈদ করলে ঐ ব্যক্তির রোযা হবে ৩১ বা ৩২টি। আবার বাংলাদেশে রোযা শুরু করে অন্য দেশে গিয়ে ঈদ করলে ঐ ব্যক্তির রোযা হবে ২৭ বা ২৮টি। অথচ হাদীস শরীফে বলা হয়েছে আরবী মাস ২৯-এর কম হবেনা এবং ৩০-এর বেশী হবেনা। তাই পবিত্র ইসলাম ধর্মে ২৭, ২৮ অথবা ৩১, ৩২টি রোযার কোন বিধান নেই। বাংলাদেশের সাবেক প্রেসিডেন্ট এরশাদ সাহেব কোরিয়াতে ঈদের নামায পড়ে এসে দেখেন বাংলাদেশে আরও একদিন রোযা বাকী। এধরনের সমস্যার সমাধান কখনই সম্ভব নয়।

চার: হাদীস শরীফের ভাষ্য অনুযায়ী তাকবীরে তাশরীক বলা শুরু করতে হবে আরাফার দিনের ফজর নামায থেকে। কিন্তু আমাদের দেশে উক্ত তাকবীর বলা শুরু করা হয় এখানকার স্থানীয় ৯ই জিল-হাজ্জ। যে দিন সারা পৃথিবীতে ১০ বা ১১ জিল-হাজ্জ। ফলে ঐ দিনটি আরাফার দিনতো নয়ই বরং আরাফার দিনের পরের দিন বা তৎপরবর্তী দিন। তাহলে ফলাফল দাড়ালো বাংলাদেশের স্থানীয় তারিখ অনুসরণের কারণে আমাদের পাঁচ বা দশ ওয়াক্ত নামাজের ওয়াজিব তাকবীর ছুটে যাচ্ছে। আবার শেষ দিকে গিয়ে এমন এক বা দু’দিন তাকবীর বলছি যখন আমলটির ওয়াজিব আর বাকী নেই।

পাঁচ: যে সকল সম্মানিত ভাইয়েরা একাধিক পশু কুরবানী দেন, তাদের অনেকেই বাংলাদেশের স্থানীয় ১১ ও ১২ জিল-হাজ্জ তারিখে কুরবানী দিয়ে থাকেন। কিন্তু কুরআন, সুন্নাহর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ঐ সময় সারা বিশ্বে ১৩ বা ১৪ জিল-হাজ্জ। (যদি চাঁদ দেখায় ২দিনের তারতম্য হয়)। তাহলে ফলাফল দাঁড়ালো তাদের দু’দিনের কুরবানী-ই বিফলে যাচ্ছে। কারণ কুরবানী করার সময় ১০ থেকে ১২ জিল-হাজ্জ। ১৩ ও ১৪ জিল-হাজ্জ কুরবানী করা যায়না।

ছয়: রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন যে, আরাফার দিনে রোযার ব্যাপারে আমি আল্লাহর উপর এ বিশ্বাস রাখি, ঐ দিনের রোযার বিনিময়ে আল্লাহ পাক রোযাদারের পূর্ববর্তী এক বছর এবং পরবর্তী এক বছরের গুনাহ্‌ ক্ষমা করে দেন।
----- (মুসলিম শরীফ, খন্ড-১, পৃঃ-৩৬৭)

পবিত্র হাদীস ঘোষিত এ মহান পূন্য লাভের আশায় অগণিত মুসলিম নর-নারী বাংলাদেশের স্থানীয় ৯ জিল-হাজ্জ রোযা রাখেন। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হল ঐ দিন মক্কা মোয়াজ্জেমা সহ সারা বিশ্বে ১০ বা ১১ জিল-হাজ্জ। অর্থাৎ কোন ভাবেই ঐ দিনটি আরাফার দিনতো নয়ই বরং কুরবানীর দিন বা তাশরীকের প্রথম দিন। যে দিন গুলোতে রোযা রাখা চার মাযহাবের সকল ইমাম ও আলেমের ঐক্যমতে হারাম। তাহলে ফল হল স্থানীয় চাঁদ দেখার হিসেবে একটি নফল রোযা রেখে হারামে নিমজ্জিত হচ্ছেন অগণিত মুসলিম নারী-পুরুষ।

সাত: পবিত্র লাইলাতুল ক্বদর, লাইলাতুল মি’রাজ এবং লাইলাতুল বারায়াত আল্লাহর নিকট এক একটি সুনির্দিষ্ট রাত। যা সমগ্র বিশ্বের সকল মানুষের জন্য একই রাতে সংগঠিত হয়। কিন্তু বিশ্বের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর জন্য বিভিন্ন দিন এ রাত গুলো নির্ধারণ করার ফলে এসকল রাতের ফযীলত থেকে দেশবাসীকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। যখন সংবাদ পৌঁছেনি তখন স্থানীয় চাঁদ দেখার ভিত্তিতে এসব পর্ব পালন ওজর হিসেবে যুক্তিযুক্ত ছিল। কিন্তু বর্তমানে সে ওজর নেই।

আট: আল্লাহ পাক এরশাদ করেন “নিশ্চয়ই আমি এ কুরআনকে নাযিল করেছি ক্বদরের রাতে।”
----- (সুরাহ আল ক্বদর)

পবিত্র লাইলাতুল ক্বদর আল কুরআন ঘোষিত একটি মর্যাদাপূর্ণ রাত। যা হাজার মাসের চেয়ে উত্তম। আমরা যারা একদিন পরে রোযা শুরু করি আমরাতো কখনই ঐ রাত পাইনা। কারণ আরব বিশ্বে যেদিন বেজোড় রাত আমাদের দেশে সেদিন জোড় রাত। তাদের বেজোড় রাত হিসাবে ক্বদর হলে আমরা কখনই ক্বদর রাত পেতে পারিনা। কারণ এ রাত তো একটিই। যা অঞ্চলের ভিন্নতায় কয়েক রাত মেনে নেয়া হাস্যকর বৈকি?


আহবান

হে মুসলিমগণ! সিয়াম পালন করার দিন এবং সিয়াম পালন বন্ধের সময়ের ব্যপারে ঐক্যবদ্ধ থাকার যে শরঈ বিধান রয়েছে তা বাস্তবায়নের জন্য আমরা আপনাদেরকে আহবান করছি। এই উপলক্ষ্যে আমরা আপনাদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি মুসলিম উম্মাহর জন্য খলীফা নিয়োগের দায়িত্বের ব্যাপারে যা আল্লাহ আমাদের উপরে অর্পণ করেছেন; যিনি আমাদের ভিন্নমত এবং ভিন্ন অবস্থানকে এক করবেন, যিনি সমস্ত শরঈ আহকাম বাস্তবায়ন করবেন, ইসলামের আহ্বানকে পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিবেন এবং আল্লাহর বাণীকে সুউচ্চে তুলে ধরবেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বলেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اسْتَجِيبُوا لِلَّهِ وَلِلرَّسُولِ إِذَا دَعَاكُمْ لِمَا يُحْيِيكُمْ

"হে ঈমানদারগণ, যখন আল্লাহ ও তাঁর রাসূল এমন কোনো কিছুর দিকে তোমাদেরকে আহ্বান করেন যা তোমাদের মধ্যে জীবনের সঞ্চার করে তখন সেই আহ্বানে সাড়া দাও।" [আনফাল: ২৪]